বিশেষ প্রতিবেদক
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আহত দাবি করে জমা পড়া নতুন আবেদনগুলোর যাচাই-বাছাইয়ে বড় ধরনের জালিয়াতি ও অনিয়মের চিত্র তথ্য সামনে এসেছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থাগুলোর তদন্তে প্রায় ২০০টি আবেদন সম্পূর্ণ ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়া আরও প্রায় ৬০০টি আবেদনে তথ্যগত অসংগতি, একই ব্যক্তির একাধিক আবেদন এবং এমনকি শহীদের নামে আহত হিসেবে আবেদন করার মতো গুরুতর অনিয়ম শনাক্ত করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গণঅভ্যুত্থানে আহতদের নতুন গেজেটভুক্তির জন্য জমা পড়া আবেদনগুলোর মধ্য থেকে ২ হাজার ৩৮৮টি আবেদন পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) যৌথভাবে যাচাই-বাছাই করে। তদন্ত শেষে ১ হাজার ৫৯০ জন আবেদনকারীর তথ্যের সত্যতা পেয়েছে সংস্থা দুটি। প্রকৃত আহত হিসেবে প্রমাণিত এই ১ হাজার ৫৯০ জনকে চূড়ান্তভাবে জুলাইযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত করার আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে।
বর্তমানে দেশে তিনটি পৃথক ক্যাটেগরিতে গেজেটভুক্ত আহত জুলাইযোদ্ধার মোট সংখ্যা ১৪ হাজার ৩৭০ জন। নতুন যাচাইকৃত ১ হাজার ৫৯০ জন এই তালিকায় যুক্ত হলে দেশে সরকারি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত আহত জুলাইযোদ্ধার মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১৫ হাজার ৯৬০ জনে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মাঠপর্যায় থেকে এখনো নতুন নতুন আবেদন জমা পড়ছে। জমাকৃত এসব আবেদনও সমান্তরালভাবে যাচাই-বাছাই করা হবে এবং সত্যতা পাওয়া গেলে তাদের পর্যায়ক্রমে গেজেটভুক্ত করা হবে। তবে অতীতে অসত্য তথ্য দিয়ে কেউ গেজেটভুক্ত হয়ে থাকলে বা ভবিষ্যতে এমন প্রমাণ মিললে, তাদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে মন্ত্রণালয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্যানুযায়ী, গত বছরের শুরুর দিকে ‘জুলাই শহীদ ও আহত জুলাইযোদ্ধা’দের প্রথম দফার গেজেট প্রকাশের পর দেশজুড়ে নতুন করে অনেকেই আহত ‘জুলাইযোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতির দাবি জানিয়ে আবেদন করতে শুরু করেন। দেশের বিভিন্ন জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিদপ্তরে এসব আবেদন জমা পড়ে। এর আগে প্রকাশিত গেজেটের কিছু নাম নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ায় সরকার ১৩ জন শহীদ এবং ২১৯ জন আহত জুলাইযোদ্ধার নাম তালিকা থেকে বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল। পূর্বের সেই বিতর্ক এড়াতে এবং তালিকার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবার গোয়েন্দা ও তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে কঠোরভাবে আবেদনকারীদের তথ্য মাঠপর্যায়ে যাচাই করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রথম দফা গেজেট প্রকাশের পর নতুন করে মোট ৩ হাজার ৩১৬টি আবেদন জমা পড়েছিল। এর মধ্যে প্রাথমিক স্ক্রিনিং শেষে ২ হাজার ৩৮৮টি আবেদন চূড়ান্ত তদন্তের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষায়িত শাখায় পাঠানো হয়। তদন্ত শেষে ১ হাজার ৫৯০ জনের তথ্য সঠিক পাওয়া যায়, যাদের মধ্যে ৭৮৯ জনকে ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমে (এমআইএস) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আরও ২৭৬ জনের এমআইএসভুক্তির কাজ চলমান রয়েছে এবং ২১০ জনের নথিপত্র যাচাই সম্পন্ন হয়েছে।
গোয়েন্দা তদন্তে যে ২০০টি আবেদন সরাসরি ভুয়া হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, সেগুলোর সপক্ষে কোনো আইনগত বা চিকিৎসা সংক্রান্ত ভিত্তি পাওয়া যায়নি। বাকি প্রায় ৬০০ আবেদনের মধ্যে দুই তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনে পারস্পরিক অসঙ্গতি, একই ব্যক্তির একাধিক আবেদন, এবং অন্যান্য তথ্যগত ত্রুটি পাওয়া গেছে। তবে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ধারণা, এসব অসংগতিপূর্ণ আবেদনের নথিপত্র পুনর্নিরীক্ষণ করলে আরও প্রায় ১০০টির মতো প্রকৃত আহতের সন্ধান মিলতে পারে। মাঠপর্যায়ের যাচাইয়ে দেখা গেছে, অনেক আবেদনকারী আন্দোলনে আহত হওয়ার সপক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বা হাসপাতালের চিকিৎসার মূল নথি উপস্থাপন করতে পারেননি। অনেকের দাখিলকৃত ছবি বা তথ্য স্থানীয় তদন্তে অসত্য প্রমাণিত হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিশাখার যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ ফারুক হোসেন এই প্রক্রিয়ার সার্বিক বিষয়ে জানান, প্রকৃত আহত ব্যক্তিদেরই জুলাইযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে আবেদনগুলো অত্যন্ত কঠোরভাবে যাচাই করা হয়েছে। কোনো ভুয়া আবেদনকারী যেন কোনো ফাঁকফোকর দিয়ে গেজেটভুক্ত হতে না পারেন, সেটি নিশ্চিত করতেই এই দীর্ঘ ও নিবিড় তদন্ত প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে।
সরকারি সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে এ পর্যন্ত ৮৪৩ জন শহীদ এবং তিন শ্রেণিতে মোট ১৪ হাজার ৩৭০ জনের গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শহীদ পরিবারের জন্য এককালীন ৩০ লাখ টাকা, মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতা এবং আবাসন সুবিধার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অন্যদিকে আহতদের শারীরিক সক্ষমতা ও ক্ষতির শ্রেণিভেদে এককালীন আর্থিক সহায়তা, মাসিক ভাতা এবং পুনর্বাসনমূলক প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
এই বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন জানিয়েছেন, সব ধরনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে শুধু প্রকৃত জুলাইযোদ্ধাদেরই গেজেটভুক্ত করা হচ্ছে। জাতীয়ভাবে এই তালিকার সংবেদনশীলতা ও গুরুত্ব বিবেচনা করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখতে কোনো ধরনের আপস করা হবে না।