বিশেষ প্রতিবেদক
গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে নবগঠিত সরকারের চার মাস পূর্ণ হয়েছে। এই চার মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ ও সার্বিক কার্যক্রমে দেশের সিংহভাগ নাগরিক সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। সাম্প্রতিক এক দেশব্যাপী জনমত জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, দেশের ৭৫ দশমিক ৩ শতাংশ উত্তরদাতা প্রধানমন্ত্রীর কর্মক্ষমতা ও সিদ্ধান্তের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেছেন। বিপরীতে ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ তার কাজের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং ৭ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দেশে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই এই সরকার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার আমূল সংস্কার এবং নির্বাচন ব্যবস্থার আধুনিকায়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে শুরু করে। বিশেষ করে নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত গণভোটে গৃহীত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নে সরকারের প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দেয়। এই সনদের প্রধান শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদকাল নির্দিষ্ট করা এবং জাতীয় সংসদে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তন করা। সরকারের এই চার মাসের মাথায় সাধারণ মানুষের মূল্যায়ন জানতে এই সমীক্ষাটি চালানো হয়।
জরিপের আঞ্চলিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের মধ্যে সরকার প্রধানের প্রতি সমর্থনের ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি সবচেয়ে বেশি সমর্থন লক্ষ্য করা গেছে রংপুর বিভাগে, যেখানে প্রায় ৮৩ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ তার কার্যক্রমের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে, রাজধানী ঢাকায় এই সমর্থনের হার তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে কম, যা ৭০ দশমিক ৪ শতাংশ। তবে জরিপ পরিচালনাকারীদের মতে, ঢাকার তুলনায় রংপুর বিভাগে স্যাম্পল ক্লাস্টার কম থাকায় ফলাফলে কিছুটা তারতম্য তৈরি হয়ে থাকতে পারে। এছাড়া ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে শহরাঞ্চলে যেখানে সমর্থনের হার ৭০ দশমিক ১ শতাংশ, সেখানে গ্রামাঞ্চলে এই হার কিছুটা বেশি—প্রায় ৭৮ দশমিক ৫ শতাংশ।
বয়সভিত্তিক সূচক বিশ্লেষণে দেখা যায়, তরুন থেকে মধ্যবয়সী সব স্তরের মানুষের মধ্যেই সরকারের কার্যক্রমের প্রতি সমর্থন প্রায় সমান। তবে ৬০ বছরের বেশি বয়সী জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের মধ্যে এই সমর্থনের হার কিছুটা কম, যা ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ। সামগ্রিকভাবে দেশের প্রায় তিন হাজার প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের ওপর এই জরিপ কার্য পরিচালনা করা হয়।
সমীক্ষাটির পদ্ধতিগত বিষয়ে জানা গেছে, সম্পূর্ণ নিজস্ব তত্ত্বাবধানে এবং মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীদের মাধ্যমে এই তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। কোনো তৃতীয় পক্ষের সহায়তা ছাড়াই জরিপের ৭০ শতাংশ সাক্ষাৎকার সরাসরি বা মুখোমুখি এবং বাকি ৩০ শতাংশ সাক্ষাৎকার মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। মুখোমুখি সাক্ষাৎকারে যেখানে অনুমোদনের হার ছিল ৭৫ দশমিক ৮ শতাংশ, সেখানে ফোনে সাক্ষাৎকার দেওয়া নাগরিকদের মধ্যে এই হার ছিল ৭৪ দশমিক ১ শতাংশ। গবেষকদের মতে, এই দুই মাধ্যমের ফলাফলের পার্থক্য পরিসংখ্যানগতভাবে অত্যন্ত সামান্য।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জনমিতিক মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এই জরিপের তথ্য বিন্যাস ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। জাতীয়ভাবে পরিচালিত এই সমীক্ষায় মার্জিন অব এরর বা ত্রুটির সম্ভাব্য মাত্রা ধরা হয়েছে প্লাস-মাইনাস ২ দশমিক ১ থেকে ২ দশমিক ৪ শতাংশ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্র সংস্কারের প্রাথমিক ধাপে এই জনমত সরকারের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে কাজ করবে, তবে সনদের প্রতিশ্রুতিগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করাই হবে আগামী দিনগুলোতে এই সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।