আইন আদালত ডেস্ক
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর বেশ কিছু ধারা অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানির রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। আগামী বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ এ বিষয়ে চূড়ান্ত রায় প্রদান করবেন।
বুধবার প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগে টানা তিন কার্যদিবস ব্যাপী চলা শুনানি শেষ হওয়ার পর রায় ঘোষণার এই দিন নির্ধারণ করা হয়। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। অন্যদিকে রিট আবেদনকারীদের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির এবং ড. শরীফ ভূঁইয়া।
এর আগে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর বিচারপতিদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ পৃথক দুটি রিট আবেদনের চূড়ান্ত শুনানি শেষে পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু অংশ অসাংবিধানিক ও অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছিলেন। হাইকোর্টের ওই রায়ের ফলে দীর্ঘ দিন পর দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত হওয়ার আইনি পথ উন্মুক্ত হলেও কিছু সাংবিধানিক ও প্রায়োগিক জটিলতা থেকে যায়। এ কারণে হাইকোর্টের রায়ের আইনি অস্পষ্টতা দূর করতে সুশাসনের জন্য নাগরিক-এর (সুজন) সম্পাদকসহ চার বিশিষ্ট ব্যক্তি, নওগাঁর বাসিন্দা মো. মোফাজ্জল হোসেন এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে পৃথক তিনটি আপিল আবেদন করা হয়। গত বছরের ১৩ নভেম্বর সর্বোচ্চ আদালত এই আপিল শুনানির অনুমতি প্রদান করেছিলেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইতিহাসে পঞ্চদশ সংশোধনী একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাব বিস্তারকারী অধ্যায়। ২০১১ সালের ৩০ জুন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাতীয় সংসদে এই পঞ্চদশ সংশোধনী আইন পাস করা হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে বড় ধরনের পরিবর্তনের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপ করা হয়েছিল। এছাড়াও শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান, সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ পরিবর্তনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি পুনর্বিন্যাস এবং এক ক্রান্তীয় ধারার সংযোজনসহ সংবিধানের মোট ৫৪টি ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন আনা হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপের পর থেকেই দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তীব্র বিতর্ক ও বিরোধের সৃষ্টি হয়। তৎকালীন প্রধান বিরোধী দলসমূহ এই ব্যবস্থার বিরোধিতা করে এবং এর পর থেকে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনগুলোর গ্রহণযোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে নানামুখী প্রশ্ন ওঠে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আপিল বিভাগের এই রায়ের ওপর বাংলাদেশের আগামী দিনের নির্বাচন ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করছে। যদি আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন বা সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেন, তবে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে স্থায়ী রূপ পাওয়ার পথ সুগম হবে। আর তা দেশের সামগ্রিক শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর রূপরেখা নির্ধারণে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে।