অর্থনীতি প্রতিবেদক
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের কর্মউপযোগিতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি, দীর্ঘদিনের কনটেইনার জট নিরসন এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রোধে বড় ধরনের নিলামের উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস। আগামী জুলাই মাসজুড়ে সম্পূর্ণ ডিজিটাল বা ‘ই-অকশন’ (E-Auction) পদ্ধতিতে দুই দফায় মোট ১৬৮ কনটেইনার পণ্য নিলামে বিক্রি করা হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষের এই সময়োপযোগী পদক্ষেপের ফলে বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা খালাসবিহীন পণ্যের জট কমবে এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ের গতি আরও ত্বরান্বিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার একক কনটেইনার আমদানি-রপ্তানি হয়ে থাকে। তবে আমদানিকারকদের সময়মতো পণ্য খালাস না করা, শুল্কায়ন জটিলতা কিংবা বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়ার কারণে অনেক পণ্য বছরের পর বছর বন্দরে পড়ে থাকে। এর ফলে বন্দরের ইয়ার্ডগুলোতে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত স্থান দখল হয়ে যায়, যা স্বাভাবিক কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং ভৌত ও আর্থিক নিরাপত্তার পাশাপাশি জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এই নিলামের আয়োজন করা হয়েছে। এনবিআর জানিয়েছে, নিলাম প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি স্বচ্ছ, প্রভাবমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক করতে ডিজিটাল ই-অকশন পোর্টালের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হবে।
কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের স্থায়ী আদেশ অনুযায়ী প্রথম দফায় ‘ই-অকশন নং-০৭/২০২৬’ এর আওতায় মোট ৫৫টি লটে ৭৫ কনটেইনার পণ্য বিক্রি করা হবে। এই নিলামের পণ্য তালিকায় রয়েছে বিভিন্ন ধরনের মূলধনী যন্ত্রপাতি (ক্যাপিটাল মেশিনারিজ), ফেব্রিক্স, পিভিসি ফ্লেক্স ব্যানার, ব্যাডমিন্টন র্যাকেট, এলিভেটর, এয়ার ফিল্টার, ক্রাফট লাইনার পেপার এবং লবণসহ বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক পণ্য। আগ্রহী ক্রেতা ও বিডাররা আগামী ১৩ জুলাই থেকে ২০ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত অফিস চলাকালীন সময়ে বন্দরে গিয়ে এসব পণ্য সরেজমিনে পরিদর্শন করতে পারবেন। এরপর কাস্টমসের অফিসিয়াল পোর্টালে নিবন্ধন করে ১২ জুলাই থেকে ২২ জুলাই ২০২৬ তারিখ বিকেল ৩টা পর্যন্ত অনলাইনে দরপত্র দাখিল করা যাবে। এই নিলামের দরপত্র বাক্স উন্মুক্ত করা হবে আগামী ২২ জুলাই বিকেল সাড়ে ৩টায়।
অন্যদিকে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের স্থায়ী ও বিশেষ আদেশ অনুসরণে আয়োজিত ‘বিশেষ ই-অকশন নং-০৮/২০২৬’ এর মাধ্যমে দ্বিতীয় দফায় ৭৬টি লটে মোট ৯৩ কনটেইনার পণ্য নিলামে তোলা হবে। এই চালানের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এতে পণ্যের কোনো সংরক্ষিত মূল্য বা ‘রিজার্ভড ভ্যালু’ নির্ধারণ করা থাকছে না। এই বিশেষ নিলামে যেসব পণ্য রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক দ্রব্যাদি (কেমিকেল), বিটুমিন, কলকারখানার যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ, প্লাস্টিক শিট, চেস্ট ফ্রিজার, পাইপ, বিভিন্ন প্রকার কাপড়, কাগজ এবং গৃহস্থালি সামগ্রী। এই পণ্যগুলো পরিদর্শনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬ জুলাই থেকে ২৩ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত। আগ্রহী ক্রেতারা ১৪ জুলাই থেকে ২৬ জুলাই ২০২৬ তারিখ বিকেল ৩টা পর্যন্ত অনলাইনে বিড করতে পারবেন। এই বিশেষ নিলামের দরপত্র বাক্স উন্মুক্ত করা হবে ২৭ জুলাই সকাল ১১টায়।
নিলাম প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার জন্য কাস্টমস হাউস কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়মাবলী ও শর্ত নির্ধারণ করে দিয়েছে। আগ্রহী বিডারদের ঘরে বসেই কাস্টমসের নির্ধারিত ই-অকশন পোর্টালে (http://auction.bdcustoms.gov.bd) প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে। অনলাইন বিডিংয়ের সময় প্রস্তাবিত দরমূল্যের ন্যূনতম ১০ শতাংশ জামানত বা আর্নেস্ট মানির স্ক্যান কপি পোর্টালে আপলোড করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জামানতের মূল কাগজপত্র কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করতে হবে। চূড়ান্তভাবে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত ব্যক্তিদের আমদানি নীতি আদেশ ২০২১-২০২৪ এর প্রযোজ্য শর্তাবলী ও নিয়মকানুন কঠোরভাবে প্রতিপালন সাপেক্ষে পণ্য খালাসের অনুমতি দেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বন্দর কর্মকর্তাদের মতে, ম্যানুয়াল বা সনাতন পদ্ধতির নিলামে অতীতে অনেক সময় সিন্ডিকেট তৈরি বা অনিয়মের সুযোগ থাকত। কিন্তু এনবিআর প্রবর্তিত এই আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল ই-অকশন ব্যবস্থার ফলে নিলাম প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক হবে। ঘরে বসেই যেকোনো বৈধ ব্যবসায়ী এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারছেন, যা দেশের সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত করতে সহায়ক। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে অবিক্রিত ও অখালাসকৃত পণ্য এভাবে দ্রুত নিষ্পত্তি করার ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার ধারণক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে, যা সামগ্রিক আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যকে আরও গতিশীল ও সাশ্রয়ী করবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আশা প্রকাশ করেছে যে, এই স্বয়ংক্রিয় নিলাম কার্যক্রম দেশের প্রধান রাজস্ব আহরণকারী এই সমুদ্রবন্দরের কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় সম্পদের যথাযথ ব্যবস্থাপনায় একটি দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।