শেয়ার বাজার ডেস্ক
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ঝিল বাংলা সুগার মিলস লিমিটেডের শেয়ার লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) কর্তৃপক্ষ। কোনো সুনির্দিষ্ট ও যৌক্তিক কারণ ছাড়া অস্বাভাবিকভাবে শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষিতে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় আজ মঙ্গলবার তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
আজ সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবসে লেনদেন শুরুর পরপরই ঝিল বাংলা সুগার মিলসের প্রতিটি শেয়ারের দাম ১৪ টাকা বা সাড়ে ৮ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায়। লেনদেন স্থগিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বাজারটিতে কোম্পানিটির প্রায় ৬৯ হাজার শেয়ার হাতবদল হয়েছে। ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, গত ১৮ জুন কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের বাজারমূল্য ছিল ১২২ টাকা, যা মাত্র ১২ কার্যদিবসের ব্যবধানে ৫৯ টাকা বা প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে সর্বশেষে ১৮১ টাকায় পৌঁছায়। এই লাগামহীন দরবৃদ্ধির প্রেক্ষিতে ডিএসইর পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া হলে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ জানায়, মূল্যবৃদ্ধির পেছনে তাদের কাছে কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য বা সুনির্দিষ্ট কারণ নেই। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এই ধরনের মূল্যবৃদ্ধিকে কারসাজি ও অস্বাভাবিক হিসেবে বিবেচনা করছেন।
এর আগে সোনারগাঁও টেক্সটাইল এবং শ্যামপুর সুগার মিলসের শেয়ারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অস্বাভাবিক প্রবণতা রোধে লেনদেন স্থগিতের ব্যবস্থা নিয়েছিল ডিএসই কর্তৃপক্ষ। তবে লেনদেন স্থগিতের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আজ পুনরায় লেনদেন শুরু হলে প্রতিষ্ঠান দুটির শেয়ারের দাম আবারও যৌক্তিক কারণ ছাড়াই বৃদ্ধি পেতে দেখা যায়। লেনদেন শুরুর প্রথম দুই ঘণ্টার মধ্যে সোনারগাঁও টেক্সটাইলের শেয়ারের দাম ৪ টাকা ৩০ পয়সা বৃদ্ধি পেয়ে ১০১ টাকায় এবং শ্যামপুর সুগারের শেয়ারের দাম ১৩ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ২৯৮ টাকায় দাঁড়ায়।
পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিক এই পরিস্থিতি ও কঠোর অবস্থান সম্পর্কে জানা যায়, গত ৪ জুন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব গ্রহণ করে। দায়িত্ব গ্রহণের পর এক সংবাদ সম্মেলনে বিএসইসির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মাসুদ খান ঘোষণা দেন, বাজারে কারসাজিকারকদের বিরুদ্ধে কমিশন ‘রিয়েল-টাইম’ বা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং অতীতের তুলনায় কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করবে। বিশেষ করে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে জেড শ্রেণিভুক্ত দুর্বল কোম্পানিগুলোর ওপর বিশেষ নজরদারি রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করে বর্তমান কমিশন।
কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অনুষ্ঠিত একাধিক বৈঠকে নির্দেশনা দেওয়া হয় যে, দুর্বল মানের কোম্পানির শেয়ারের দাম সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া বৃদ্ধি পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে লেনদেন স্থগিত করে দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। বিএসইসির এই বিশেষ নির্দেশনার আলোকেই আজ ঝিল বাংলা সুগার মিলসের শেয়ার লেনদেন স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয় ডিএসই।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ধারাবাহিক লোকসান ও কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ছাড়া পুঁজিবাজারে দুর্বল কোম্পানির শেয়ারের এমন উর্ধ্বমুখী প্রবণতা বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে। বিনিয়োগকারীদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে এবং কারসাজি চক্রের অপতৎপরতা বন্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের বিকল্প নেই।
উল্লেখ্য, ১৯৮৮ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া ঝিল বাংলা সুগার মিলস বর্তমানে পুঁজিবাজারের ‘জেড’ বা দুর্বল শ্রেণিভুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক লোকসানের কারণে কোম্পানিটি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ প্রদান করতে পারছে না। সর্বশেষ প্রকাশিত অন্তর্বর্তীকালীন আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুলাই থেকে মার্চ প্রান্তিকে কোম্পানিটি শেয়ার প্রতি ৫৩ টাকার বেশি লোকসান গুনছে। এমতাবস্থায় লোকসানি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের এমন কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি করছে বলে মনে করছেন বাজার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।