বিশেষ প্রতিবেদক
দেশের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতির বিগত জুন মাসে উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে। এই সময়ে মব জাস্টিস বা গণপিটুনি এবং রাজনৈতিক সংঘাতের ঘটনায় ব্যাপক হতাহতের চিত্র উঠে এসেছে। মানবাধিকার সংস্থা মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সদ্য সমাপ্ত জুন মাসে কেবল মব সহিংসতার ঘটনাতেই দেশজুড়ে অন্তত ৩৩ জন নিহত এবং ১২৬ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে প্রাণ হারিয়েছেন আরও ৭ জন।
বিগত মে মাসের তুলনায় জুন মাসে গণপিটুনির ঘটনায় আহতের সংখ্যা প্রায় ৭৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মে মাসে মব সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা ছিল ৩২ এবং আহতের সংখ্যা ছিল ৭১। সমাজবিজ্ঞান ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চোর বা ছিনতাইকারী সন্দেহে, গুজব কিংবা পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝিকে কেন্দ্র করে এভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। গণপিটুনির শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে সাধারণ পথচারী, শ্রমজীবী মানুষ, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, পুলিশ সদস্য এমনকি বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে কোনো অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করেই তাৎক্ষণিক উত্তেজনার বশে সংঘবদ্ধ হামলা চালানো হচ্ছে। এসব ঘটনার পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাও জননিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করছে।
প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জুন মাসে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মানবাধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ ও পারস্পরিক কোন্দল, ব্যাপক গ্রেপ্তার, অজ্ঞাতপরিচয় লাশ উদ্ধার এবং সীমান্ত এলাকার উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সব মিলিয়ে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। জুন মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় দেশের বিভিন্ন স্থানে ৩০৩ জন আহত হয়েছেন এবং দলীয় সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন ৭ জন। অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের চোরাগোপ্তা হামলা ও দলীয় কোন্দলের এই ধারাবাহিকতা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে ক্রমান্বয়ে অনিরাপদ করে তুলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
একই সময়ে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থার হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাও রেকর্ড করা হয়েছে। জুনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে, বাহিনীর সাথে কথিত গোলাগুলিতে ৩ জন নিহত হয়েছেন এবং কারা হেফাজতে মারা গেছেন আরও ৯ জন। অন্যদিকে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক চিত্র দেখা গেছে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জুন মাসে অন্তত ১৯ জন সাংবাদিক হামলা, নির্যাতন ও হুমকির শিকার হয়েছেন। এছাড়া আইনি হয়রানির মুখোমুখি হয়েছেন ৬ জন এবং গ্রেপ্তার হয়েছেন ৩ জন সাংবাদিক।
দেশের জননিরাপত্তা ও সামাজিক অপরাধের চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত মাসে দেশের বিভিন্ন নদী, সড়ক, রেললাইন ও ফসলি জমি থেকে মোট ৬৫টি অজ্ঞাত বা পরিত্যক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, যা মে মাসের ৫৩টির তুলনায় বেশি। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাও ছিল ঊর্ধ্বমুখী; জুন মাসে ৩৪৮ জন নারী ও শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর বাইরে ৯ জন মৃত এবং ২ জন জীবিতসহ মোট ১১ জন নবজাতককে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশা, মাদক চোরাকারবারিদের অভ্যন্তরীণ ও পারস্পরিক সংঘর্ষে গত মাসে আরও ১৩ জন নিহত হয়েছেন। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অপরাধীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হওয়া এবং সামাজিক সহনশীলতা কমে যাওয়ার কারণেই মব সহিংসতা ও অন্যান্য অপরাধের মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।