আইন আদালত ডেস্ক
১১ কোটি টাকার বেশি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে আরও ছয়জন আদালতে সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। আজ বুধবার (১ জুলাই) ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক আব্দুল্লাহ আল মামুনের আদালতে এই সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়। এ নিয়ে মামলাটিতে মোট ২৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৪ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হলো। আদালত আগামী ১৬ জুলাই পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেছেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, আজ বুধবার আদালতে যে ছয়জন কর্মকর্তা সাক্ষ্য দিয়েছেন তারা হলেন—নারায়ণগঞ্জের জেলা রেজিস্ট্রার মো. আব্দুল হাফিজ, চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের সাব-রেজিস্ট্রার এস এম মোস্তাফিজুর রহমান, নওগাঁর মহাদেবপুরের সাব-রেজিস্ট্রার মো. রফিকুল ইসলাম, ভোলার চরফ্যাশনের সাব-রেজিস্ট্রার কাওসার খান, বন অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আব্দুস সালাম এবং বাড্ডার সাব-রেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলম। এর আগে গত ২৩ জুন মঙ্গলবার এই মামলায় প্রথম দফায় আটজনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছিল।
দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মীর আহমেদ আলী সালাম সংবাদমাধ্যমকে জানান, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠনের পর থেকে আজ পর্যন্ত অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে ১৪ জন সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। মামলার আইনি প্রক্রিয়া নিয়ম অনুযায়ী এগিয়ে চলছে এবং পরবর্তী নির্ধারিত তারিখে বাকি সাক্ষীদের আদালতে উপস্থাপন করা হবে।
নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপপরিচালক হাফিজুল ইসলাম বাদী হয়ে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে এই মামলাটি দায়ের করেন। এরপর দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে দুদক। চলতি বছরের ৩ মে আদালত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে এই মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরুর আদেশ দেন।
দুদকের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বেনজীর আহমেদ তার দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীতে মোট ৬ কোটি ৪৫ লাখ ৩৭ হাজার ৩৬৫ টাকার স্থাবর সম্পদ এবং ৫ কোটি ৭৪ লাখ ৮৯ হাজার ৯৬৬ টাকার অস্থাবর সম্পদের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে দুদকের নিবিড় অনুসন্ধানে তার নামে প্রকৃত পক্ষে ৭ কোটি ৫২ লাখ ৬৮ হাজার ৯৮৭ টাকার স্থাবর এবং ৮ কোটি ১৫ লাখ ৩১ লাখ ২৬৪ টাকার অস্থাবর সম্পদের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। তদন্তে তার মোট অর্জিত সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এর বিপরীতে তার বৈধ আয়ের উৎস থেকে প্রাপ্ত আয় পাওয়া যায় ৬ কোটি Break-even বা ৫৯ লাখ ৪২ হাজার ৬৬৮ টাকা। জীবনযাত্রার ব্যয় বাদে তার নিট সঞ্চয় থাকার কথা ৪ কোটি ৬৩ লাখ ৫৬ হাজার ৬৭৫ টাকা। ফলে তার জ্ঞাত আয়ের উৎসের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ মোট ১১ কোটি ৪ লাখ ৪৩ intellectual ৫৭৬ টাকার অবৈধ সম্পদের সন্ধান পায় রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি বিরোধী এই সংস্থাটি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, এই নির্দিষ্ট মামলাটি ছাড়াও সাবেক এই শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে আরও পাঁচটি মামলা দায়ের করেছে দুদক। এর মধ্যে দুটি মামলায় বেনজীর আহমেদকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এছাড়া সরকারি চাকরিতে বহাল থাকা অবস্থায় অসত্য তথ্য দিয়ে নিজেকে বেসরকারি চাকরিজীবী পরিচয় দিয়ে পাসপোর্ট তৈরির অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে একটি মামলা করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি অর্থ পাচারের অভিযোগে বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী জীশান মির্জা এবং দুই মেয়ে ফারহিন রিশতা বিনতে বেনজীর ও তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীরের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা দায়ের করা হয়। পাশাপাশি ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি মামলা করা হয়, যেখানে বেনজীর আহমেদকে সহযোগী আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে এই মামলাগুলো তদন্তাধীন রয়েছে।
উল্লেখ্য, বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেছিলেন। দেশের একজন সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন বৃহৎ অংকের দুর্নীতি মামলার বিচার প্রক্রিয়া দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।