সারাদেশ ডেস্ক
পটুয়াখালী জেলা শহরের সদর থানাসংলগ্ন জেলা পুলিশ ক্লাব মার্কেটে চাঁদা না দেওয়ায় খোকন মল্লিক (৪৪) নামে এক ব্যবসায়ীর ওপর অতর্কিত হামলা, দোকান ভাঙচুর এবং কুপিয়ে জখম করার ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) দুপুরে সংঘটিত এই হামলায় স্থানীয় মৎস্যজীবী দলের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। গুরুতর আহত অবস্থায় ওই ব্যবসায়ীকে উদ্ধার করে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ এবং সদর থানার নিকটবর্তী এলাকায় দিনেদুপুরে এ ধরনের হামলার ঘটনায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, খোকন মল্লিক জেলা পুলিশ ক্লাব মার্কেটে একটি দোকান ভাড়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পোলট্রি বা মুরগির ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন। তার অভিযোগ, পটুয়াখালী জেলা মৎস্যজীবী দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাবুল গাজী (৪৫) এবং সদর উপজেলা মৎস্যজীবী দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শামীমসহ (৩৮) তাদের কয়েকজন সহযোগী বেশ কিছুদিন ধরে তার কাছে চাঁদা দাবি করে আসছিলেন। আসন্ন পহেলা বৈশাখ উদ্যাপনের খরচ বাবদ তারা পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। খোকন মল্লিক এত বিপুল অঙ্কের চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার ওপর ক্ষিপ্ত হন অভিযুক্তরা।
ঘটনার দিন, অর্থাৎ মঙ্গলবার দুপুরে পুনরায় মুঠোফোনে চাঁদার টাকা চাওয়া হয়। এতেও তিনি রাজি না হওয়ায় দুপুর ১২টার দিকে বাবুল গাজী ও শামীমের নেতৃত্বে ১০ থেকে ১২ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তার মুরগির দোকানে অতর্কিত হামলা চালায়। এ সময় হামলাকারীরা ব্যাপক ভাঙচুর করার পাশাপাশি খোকন মল্লিককে এলোপাতাড়ি কিলঘুষি মারতে থাকে। একপর্যায়ে অভিযুক্ত বাবুল গাজী চাপাতি দিয়ে আঘাত করলে খোকন মল্লিকের হাতে গুরুতর জখম হয়। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
এই হামলার পেছনে পূর্ববর্তী আরও কিছু ঘটনার ধারাবাহিকতা রয়েছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী। খোকন মল্লিকের অভিযোগ অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা এর আগেও তার কাছে বিভিন্ন সময়ে চাঁদা দাবি করেছেন। বিগত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের দিন বিকেলে সদর থানাসংলগ্ন পৌর নিউমার্কেটে অবস্থিত তার একটি ওষুধের দোকানেও হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়েছিল। ভুক্তভোগীর দাবি, এরপর থেকে বিভিন্ন দলীয় কর্মসূচির কথা বলে এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ভয়ভীতি দেখিয়ে তার কাছ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়েছে। নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখা এবং পরিবারের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তিনি বাধ্য হয়ে এসব চাঁদা দিয়েছেন এবং ভয়ে বিষয়টি এতদিন গোপন রেখেছিলেন।
অন্যদিকে, চাঁদা দাবি ও হামলার এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত জেলা মৎস্যজীবী দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাবুল গাজী। তার দাবি, খোকন মল্লিক বিগত সরকারের দোসর ছিলেন এবং তিনি বাজারে দীর্ঘদিন ধরে মৃত মুরগি বিক্রি করে সাধারণ ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিলেন। মঙ্গলবার দুপুরে মৃত মুরগি বিক্রির বিষয়ে প্রতিবাদ করতে গেলে খোকন মল্লিক উল্টো তাদের ওপর চড়াও হন। এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে বাগবিতণ্ডা হয়, যা পরবর্তীতে সংঘর্ষে রূপ নেয়। তবে চাঁদা দাবির বিষয়টি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে তিনি দাবি করেন।
এই ঘটনার বিষয়ে পটুয়াখালী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, হামলার খবর পাওয়ার পরপরই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে পুলিশের একটি দল পাঠানো হয়েছিল। পুলিশ ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীকে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত থানায় কোনো আনুষ্ঠানিক বা লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। ওসি আরও জানান, ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে পুলিশ ঘটনাটি গভীরভাবে তদন্ত করবে এবং এর সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সদর থানার এত কাছাকাছি একটি মার্কেটে দিনেদুপুরে ব্যবসায়ীর ওপর হামলার এই ঘটনা স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ব্যবসায়িক এলাকায় চাঁদাবাজি এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের অপব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা স্থানীয় অর্থনীতির জন্য একটি বড় বাধা। অন্যদিকে, মৃত মুরগি বিক্রির মতো জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত অভিযোগ উঠলেও সেটি যাচাই এবং ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ কারও নেই। সচেতন মহলের মতে, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। এতে করে একদিকে যেমন সাধারণ ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, তেমনি রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার প্রবণতাও হ্রাস পাবে।