নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের বেকারত্ব হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতিশীলতা আনতে সরকারি চাকরিতে প্রায় পাঁচ লাখ শূন্য পদে বিশাল নিয়োগের প্রস্তুতি শুরু করেছে সরকার। নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এই মেগা নিয়োগ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাছে তাদের অধীনস্থ শূন্য পদের হালনাগাদ ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই বিপুল সংখ্যক নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে দেশের সার্বিক বেকারত্ব পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হওয়ার পাশাপাশি সরকারি সেবার মান ও পরিধি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি সরকারের সব মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ও সচিবদের কাছে এই নিয়োগ সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে একটি নির্ধারিত ছক বা ফরম্যাট সংযুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। ওই ছক অনুযায়ী প্রতিটি মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধীনস্থ দপ্তর, সংস্থা এবং মাঠ পর্যায়ের অফিসগুলোর শূন্য পদের বিস্তারিত প্রতিবেদন পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ সরকারী কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে পূরণযোগ্য পদ (প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি) এবং মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরের মাধ্যমে সরাসরি নিয়োগযোগ্য পদের (তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি) তথ্য আলাদাভাবে উল্লেখ করার সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যাতে কোনো ধরনের দীর্ঘসূত্রতা তৈরি না হয়, সে জন্যই এই সুনির্দিষ্ট ছক ব্যবহার করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সরকারের এই বিশাল নিয়োগ প্রক্রিয়ার মূল ভিত্তি হলো তাদের সর্বশেষ নির্বাচনী ইশতেহার। ইশতেহারের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জনবান্ধব প্রতিশ্রুতি ছিল ‘স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সঙ্গে পাঁচ লাখ সরকারি কর্মচারী নিয়োগ’। সূত্র জানায়, এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তাদের নিজস্ব কর্মপরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন কৌশল প্রণয়ন করেছে। প্রণীত এই কর্মপরিকল্পনাগুলো চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পাঠানো চিঠিতেও এই নির্বাচনী ইশতেহারের কথা বিশেষভাবে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী দ্রুততম সময়ের মধ্যে শূন্য পদের তথ্য সরবরাহ করা একান্ত প্রয়োজন, যাতে সমন্বিতভাবে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পদক্ষেপ নেওয়া যায়।
এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিষয়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে। বুধবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এক সংসদ সদস্যের লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে জানান যে, সরকার পাঁচ লাখ সরকারি কর্মচারী নিয়োগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে এবং এই প্রক্রিয়াটি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য জোরকদমে কাজ চলছে। তিনি সংসদকে আরও অবহিত করেন যে, সামগ্রিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বর্তমানে শুধু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং এর অধীনস্থ দপ্তর ও সংস্থাগুলোতে শূন্য পদের বিপরীতে ২ হাজার ৮৭৯ জন জনবল নিয়োগের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোতেও শূন্য পদের বিপরীতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি চাকরিতে বিপুল সংখ্যক পদ শূন্য থাকার বিষয়টি একটি জাতীয় আলোচিত ইস্যু। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সময়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাঠ প্রশাসন থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় সচিবালয় পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে লাখ লাখ পদ শূন্য থাকায় দৈনন্দিন দাপ্তরিক কাজ, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং জনসেবা প্রদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছিল। একজন কর্মকর্তার ওপর অতিরিক্ত দায়িত্বের চাপ থাকায় কাজের গুণগত মানও অনেক ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হয়। একইসঙ্গে দেশের উচ্চশিক্ষিত তরুণ সমাজের মধ্যে সরকারি চাকরির প্রতি প্রবল আগ্রহ ও নির্ভরতা থাকলেও পর্যাপ্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির অভাবে বেকারত্বের হার ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এই প্রেক্ষাপটে পাঁচ লাখ পদে নিয়োগের সিদ্ধান্তটি দেশের লাখো চাকরিপ্রত্যাশী তরুণের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পাঁচ লাখ শূন্য পদে নিয়োগের এই উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে তা দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে একটি বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। একদিকে যেমন বিপুল সংখ্যক তরুণের সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে সরকারি দপ্তরগুলোতে নতুন ও তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ তরুণ জনবল যুক্ত হওয়ার ফলে সেবার মান, গতিশীলতা এবং উদ্ভাবনী সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া, এত বিপুল সংখ্যক মানুষের নিয়মিত আয়ের সংস্থান হলে তা দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
তবে এত বড় পরিসরে ও ব্যাপক মাত্রায় নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় শতভাগ স্বচ্ছতা, মেধার যথাযথ মূল্যায়ন এবং দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য। অতীতে বিভিন্ন সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস, অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ওঠায় এবার সরকার শুরু থেকেই কঠোর অবস্থান নিয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখিত ‘স্বচ্ছতা ও দ্রুততার’ নীতি যদি মাঠ পর্যায়ে কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়, তবে এই মেগা নিয়োগ প্রক্রিয়া দেশের বেকারত্ব দূরীকরণে এবং দক্ষ জনপ্রশাসন গড়ে তোলায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।