আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যে একতরফাভাবে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত। শুক্রবার দেওয়া এক রায়ে আদালত জানায়, সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফেডারেল আইনের সীমা অতিক্রম করে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক শুল্ক আরোপ করেছিলেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এ ধরনের পদক্ষেপ দেশের পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে এবং সংবিধানে নির্ধারিত ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্নও উত্থাপন করে।
রায়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প নতুন করে বিশ্বব্যাপী ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের একটি নির্বাহী আদেশে সই করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি জানান, ওভাল অফিসে বসেই এ আদেশে স্বাক্ষর করা হয়েছে এবং এটি প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে। নতুন শুল্ক মঙ্গলবার থেকে চালু হওয়ার কথা রয়েছে।
আদালতের রায়ে উল্লেখ করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী কর ও শুল্ক নির্ধারণের ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে ন্যস্ত। প্রেসিডেন্টের পক্ষে এ ধরনের অস্বাভাবিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হলে কংগ্রেসের সুস্পষ্ট অনুমোদন প্রয়োজন। প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতে বলেন, আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন (আইইইপিএ) প্রেসিডেন্টকে সীমাহীন সময়ের জন্য যেকোনো দেশের ওপর যেকোনো হারে শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয় না। আইনে ‘নিয়ন্ত্রণ’ ও ‘আমদানি’ শব্দ থাকলেও সরাসরি ট্যারিফ আরোপের ব্যাপক ক্ষমতা সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই।
মামলাটি দায়ের করেছিল কয়েকটি অঙ্গরাজ্য ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। তাদের আইনজীবীরা শুনানিতে যুক্তি দেন, সংশ্লিষ্ট আইনে ‘ট্যারিফ’ শব্দটির উল্লেখ নেই এবং কংগ্রেস কখনো কর আরোপের সাংবিধানিক ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের কাছে হস্তান্তর করতে চায়নি। আদালতের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকরা এ যুক্তির প্রতি সমর্থন জানান।
ছয়জন বিচারক ট্রাম্পের শুল্কনীতির বিপক্ষে রায় দেন। তাদের মধ্যে তিনজন উদারপন্থি বিচারকের পাশাপাশি ট্রাম্পের মনোনীত বিচারক অ্যামি কনি ব্যারেট ও নেইল গোরসাচও ছিলেন। অন্যদিকে রক্ষণশীল বিচারক ক্লারেন্স থমাস, ব্রেট কাভানাহ ও স্যামুয়েল আলিতো সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের বিরোধিতা করেন।
আদালতের রায়ের পর আর্থিক বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ওয়াল স্ট্রিটে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক প্রায় ০.৭ শতাংশ বেড়ে দিন শেষ করে। বিনিয়োগকারীরা ধারণা করছেন, অবৈধ ঘোষিত শুল্কের ফলে আদায় করা বিপুল অর্থ ফেরত দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনও আইনি প্রক্রিয়া বাকি রয়েছে। ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, রায় মানেই শুল্ক থেকে আদায় করা অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফেরত যাবে না; বিষয়টি দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে নিষ্পত্তি হতে পারে।
এদিকে একই দিনে ট্রাম্প ‘ধারা ১২২’ নামে পরিচিত একটি প্রায় অব্যবহৃত আইনের আওতায় নতুন ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। এ আইনে প্রেসিডেন্টকে সর্বোচ্চ ১৫০ দিনের জন্য ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে কংগ্রেসকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হয়। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্বে বাণিজ্য চুক্তি করা দেশগুলোর ক্ষেত্রেও নতুন ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক প্রযোজ্য হবে এবং তারা চুক্তিতে নির্ধারিত হারের পরিবর্তে সেকশন ১২২ অনুযায়ী শুল্ক দেবে।
নতুন নির্বাহী আদেশে কিছু খনিজ, প্রাকৃতিক সম্পদ, সার, কমলা ও গরুর মাংসসহ কিছু কৃষিপণ্য, ওষুধ, ইলেকট্রনিক পণ্য এবং নির্দিষ্ট কিছু গাড়িকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবে ছাড়ের তালিকা নিয়ে স্পষ্টতা কম থাকায় সংশ্লিষ্ট খাতে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। উত্তর আমেরিকান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (ইউএসএমসিএ)-এর আওতায় কানাডা ও মেক্সিকোর বেশিরভাগ পণ্য এ শুল্ক থেকে অব্যাহতি পাবে বলে জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আদালতের রায় একদিকে নির্বাহী ক্ষমতার সীমা স্পষ্ট করেছে, অন্যদিকে নতুন শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। শুল্ক নীতিকে ঘিরে আইনি ও নীতিগত টানাপোড়েন অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলেও প্রভাব পড়তে পারে।