আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আগামী ৭ ও ৮ জুলাই তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোটের (ন্যাটো) শীর্ষ সম্মেলনে সদস্য দেশগুলো তাদের যৌথ প্রতিরক্ষার প্রতি অটল অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের জন্য ২০২৬ সালে ৭০ বিলিয়ন ইউরো সামরিক সহায়তা প্যাকেজের ঘোষণা আসতে পারে। জোটের রাষ্ট্রদূতদের দ্বারা অনুমোদিত একটি খসড়া ঘোষণাপত্রের সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে, যা আগামী সপ্তাহে অনুষ্ঠেয় শীর্ষ সম্মেলনে নেতাদের চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পেশ করা হবে।
খসড়া ঘোষণাপত্র অনুযায়ী, ন্যাটো জোটের ৩২টি সদস্য রাষ্ট্র সম্মিলিত নিরাপত্তার মূল ভিত্তি ‘অনুচ্ছেদ ৫’-এর প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থন পুনরুজ্জীবিত করেছে। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জোটভুক্ত যেকোনো একটি দেশের ওপর বহিরাগত আক্রমণ সমগ্র জোটের ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং যৌথভাবে তা প্রতিহত করা হবে।
প্রস্তাবিত এই ঘোষণাপত্রে ইউক্রেনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সামরিক ও আর্থিক সহযোগিতার একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়, ২০২৬ সালের মধ্যে ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তার অংশ হিসেবে ৭০ বিলিয়ন ইউরো দেওয়া হবে। একই সঙ্গে পরবর্তী বছর, অর্থাৎ ২০২৭ সালেও সমপরিমাণ বা ন্যূনতম একই মাত্রার আর্থিক ও সামরিক সহযোগিতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই পদক্ষেপকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা সুসংহত রাখার ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের আন্তর্জাতিক প্রয়াস হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
এর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ ব্যয় বণ্টন নিয়ে জোটের মধ্যে বেশ কিছু দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে, মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইউরোপীয় মিত্রদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধির তাগিদ দেওয়া হয়েছিল এবং ইউরোপের সার্বিক নিরাপত্তায় ওয়াশিংটনের অতিরিক্ত আর্থিক ও সামরিক ভূমিকার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। তৎকালীন পরিস্থিতিতে ন্যাটোর কার্যকারিতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রতিশ্রুতি নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও, বর্তমান খসড়া ঘোষণাপত্রটি সেই জটিলতার অবসান ঘটাতে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ জোটের সবকটি সদস্য দেশের কূটনীতিকরা যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নে একমত হয়েছেন।
ঘোষণাপত্রে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, একটি শক্তিশালী ও কার্যকর ন্যাটোর মাধ্যমে ইউরোপের সামগ্রিক নিরাপত্তা বলয় আরও জোরদার করা হবে। এর অংশ হিসেবে ইউরোপীয় দেশগুলো এবং কানাডা জোটের সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যয় ও কৌশলগত দায়িত্ব পালনে আগের চেয়ে আরও বেশি ভূমিকা ও দায়বদ্ধতা গ্রহণ করবে। এটি বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইউরোপের সামরিক নির্ভরশীলতা কিছুটা কমিয়ে নিজেদের স্বাবলম্বী করার একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।
আঞ্চলিক নিরাপত্তার পাশাপাশি বৈশ্বিক পারমাণবিক অস্থিতিশীলতা ও নৌ-নিরাপত্তার বিষয়টিও এই খসড়া ঘোষণাপত্রে গুরুত্ব পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করে ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার স্বার্থে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রাগার গড়ে তোলার যেকোনো প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করা হবে। পাশাপাশি, বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য সচল রাখার অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী মুক্ত ও নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করার জন্য ইরানের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। আঙ্কারা শীর্ষ সম্মেলনে এই খসড়াটি অনুমোদিত হলে তা বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত ভারসাম্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।