আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের দুই শীর্ষ কর্মকর্তাকে হত্যার পরিকল্পনা সংক্রান্ত মার্কিন সংবাদমাধ্যমের একটি প্রতিবেদনকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বাস্তবতাবহির্ভূত বলে দাবি করেছে ইসরায়েল। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান পরোক্ষ শান্তি আলোচনায় অংশ নেওয়া দুই শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তাকে ইসরায়েল লক্ষ্যবস্তু করতে পারে—এমন আশঙ্কায় গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ছিল ওয়াশিংটন। তবে ইসরায়েল সরকার এই অভিযোগকে তথ্যপ্রমাণহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করেছে।
উক্ত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ইরানের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে হত্যার একটি পরিকল্পনা নিয়ে ওয়াশিংটনের নীতিগত মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। মার্কিন প্রশাসনের আশঙ্কা ছিল, ইসরায়েল যদি এই দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে লক্ষ্য করে কোনো ধরনের সামরিক বা গোয়েন্দা অভিযান চালায়, তবে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর শুরু হওয়া পরোক্ষ শান্তি আলোচনা পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে। এই আশঙ্কার পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি বন্ধুভাবাপন্ন দেশের মধ্যস্থতায় তেহরানকে পরোক্ষভাবে সতর্ক করার জন্য ওয়াশিংটন উদ্যোগ নিয়েছিল বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এই দাবির তীব্র বিরোধিতা করে জানিয়েছে, ইসরায়েল ও ইরানের আলোচকদের কেন্দ্র করে প্রচারিত এই তথ্যটি সম্পূর্ণ অসত্য ও বিভ্রান্তিকর। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের মতে, এর আগেও বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের ভিত্তিহীন তথ্য ছড়ানো হয়েছে, যা বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন কোনো মাত্রা যোগ করে না। যে প্রতিবেদনের সূত্র ধরে এই আলোচনা, সেখানে বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তার বক্তব্য উদ্ধৃত করা হলেও নিরাপত্তার অজুহাতে তাদের কারও নাম প্রকাশ করা হয়নি। ফলে সংবাদের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তেল আবিব।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের লক্ষ্য করে সুনির্দিষ্ট হামলা চালানো দীর্ঘ সময় ধরে ইসরায়েলের যুদ্ধ কৌশলের একটি অন্যতম অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ওমানে এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন মাধ্যমে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র অনানুষ্ঠানিক ও সংবেদনশীল আলোচনা শুরু হওয়ার পর সার্বিক প্রেক্ষাপট অনেকটাই বদলে যায়। বিশেষ করে আব্বাস আরাগচি ও মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি ওয়াশিংটনের জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, কারণ তারা উভয়েই তেহরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
মার্কিন নীতিনির্ধারকদের মূল আশঙ্কা ছিল, এই দুই কর্মকর্তার ওপর কোনো ধরনের হামলা হলে তা কেবল আলোচনাকেই নস্যাৎ করবে না, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে একটি নতুন এবং আরও ব্যাপক মাত্রার আঞ্চলিক সংঘাতের সূত্রপাত ঘটাতে পারে। এই সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতেই ইরানকে আগেভাগে সতর্কবার্তা পৌঁছানোর একটি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এদিকে, এই রাজনৈতিক বাদানুবাদের মধ্যেই কাতারের রাজধানী দোহায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে নতুন দফার পরোক্ষ আলোচনা সমাপ্ত হয়েছে। দুই দিনব্যাপী চলমান এই বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, বিশেষ করে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্যাংকে ইরানের জব্দ থাকা বিপুল পরিমাণ অর্থ অবমুক্ত করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। তবে দীর্ঘ আলোচনার পরও স্থায়ী কোনো শান্তি চুক্তি বা বড় ধরনের অগ্রগতির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনও আসেনি। বরং পূর্বে সম্পন্ন হওয়া কিছু অমীমাংসিত প্রায়োগিক বিষয় নিয়েই উভয় পক্ষকে পুনরায় টেবিলে বসতে হয়েছে।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর পরবর্তী দফার এই কূটনৈতিক আলোচনা আবার শুরু হবে। দোহার বৈঠকে পূর্ববর্তী চুক্তির ধারাবাহিকতায় বেশ কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে এবং সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিগত আলোচনার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই বর্তমান কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে মধ্যস্থতাকারী দেশটির পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।