রাজধানী ডেস্ক
দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার তিনটি আন্তঃদেশীয় যাত্রীবাহী ট্রেন—মৈত্রী, বন্ধন ও মিতালী এক্সপ্রেস পুনরায় চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে ঢাকায় দুই দিনব্যাপী বার্ষিক আন্তঃসরকারি রেলওয়ে বৈঠক (আইজিআরএম) শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) থেকে শুরু হওয়া এই বৈঠকে দুই দেশের রেল খাতের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। বৈঠকে উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা একমত হলে আগামী মাস থেকেই কলকাতা ও নিউ জলপাইগুড়ি রুটে আন্তর্জাতিক এই ট্রেনগুলোর চলাচল আবার শুরু হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আইজিআরএম হলো বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, আন্তঃসীমান্ত ট্রেন পরিচালনা এবং পণ্য পরিবহন সংক্রান্ত দ্বিপক্ষীয় আলোচনার বার্ষিক ফোরাম। এই ধারাবাহিক বৈঠকের সর্বশেষ আয়োজন গত বছর ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও বিভিন্ন অনিবার্য কারণে ২০২৪ সালে সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়ার পর এবারই প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকে ট্রেনগুলো পুনর্চালনার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে।
বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে ট্রেন পরিষেবা পুনরায় চালুর পাশাপাশি রুট সংস্কার ও নতুন রুট সংযোজনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। এর মধ্যে রয়েছে গেদে-দর্শনা সীমান্ত দিয়ে কলকাতা ও ঢাকার মধ্যে চলাচলকারী মৈত্রী এক্সপ্রেস, যা প্রায় ৩৭৫ থেকে ৪০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে প্রায় ৯ ঘণ্টা সময় নেয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ পক্ষ থেকে ট্রেনটি পদ্মা সেতু হয়ে পরিচালনার একটি নতুন প্রস্তাবও বিবেচনাধীন রয়েছে। এছাড়া পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে কলকাতা ও খুলনার মধ্যে চলাচলকারী এবং সাড়ে পাঁচ ঘণ্টায় ১৮০ কিলোমিটার পথ অতিক্রমকারী বন্ধন এক্সপ্রেসের সার্ভিস পুনরায় চালুর রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। পাশাপাশি, ২০২১ সালে চালু হওয়া হলদিবাড়ি-চিলাহাটি সীমান্ত দিয়ে নিউ জলপাইগুড়ি ও ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের মধ্যে ৬০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া ১১ ঘণ্টার মিতালী এক্সপ্রেস চালুর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। উল্লেখ্য, এই মিতালী এক্সপ্রেসের একটি রেক ২০২৪ সালের জুলাই মাসের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বাংলাদেশে আটকে পড়েছিল এবং পরবর্তীতে গত ডিসেম্বরে তা নিরাপদে ভারতে ফিরে যায়।
যাত্রীবাহী ট্রেন পুনর্চালনার পাশাপাশি এবারের বৈঠকে বাংলাদেশ পক্ষ থেকে রাজশাহী ও কলকাতার মধ্যে সম্পূর্ণ নতুন একটি যাত্রীবাহী ট্রেন চালুর সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করা হতে পারে। দুই দেশের রেল যোগাযোগ আরও সুদৃঢ় করতে এই নতুন রুট চালুর মাধ্যমে পশ্চিমাঞ্চলের যাত্রীদের যাতায়াত সহজতর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
যাত্রীসেবা সম্প্রসারণের বাইরেও বৈঠকে দুই দেশের মধ্যকার স্থগিত থাকা বিভিন্ন রেল অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প এবং পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকার কমলাপুর থেকে গাজীপুরের জয়দেবপুর পর্যন্ত দুটি নতুন ডাবল রেললাইন নির্মাণকাজের অগ্রগতি এবং তা দ্রুত বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে দুই দেশের প্রতিনিধিদল মতবিনিময় করছেন। এই লাইনগুলোর কাজ সম্পন্ন হলে রাজধানী ও এর সংলগ্ন এলাকার রেল চলাচলের জট বহুলাংশে হ্রাস পাবে এবং অভ্যন্তরীণ ট্রেনের পাশাপাশি আন্তঃদেশীয় ট্রেনগুলোর শিডিউল ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত হবে।
এদিকে রেলওয়ের বহর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে ভারত বাংলাদেশকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে মোট ২০০টি নতুন ব্রডগেজ এলএইচবি (লিংক হফম্যান বুশ) কোচ সরবরাহ করার কথা রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে ১৯টি কোচের একটি রেক ভারতের পাঞ্জাবের কাপুরথালা রেল কোচ ফ্যাক্টরি থেকে ইতিমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং তা প্রেরণের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের আওতায় আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত এই কোচগুলো পর্যায়ক্রমে যুক্ত হতে শুরু করবে।
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের মাধ্যমে দুই দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার অচলাবস্থা কাটবে এবং বাণিজ্য ও পর্যটন খাতের পারস্পরিক সহযোগিতা নতুন গতি পাবে। ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরু হলে উভয় দেশের সাধারণ যাত্রী, চিকিৎসা নেওয়া ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীরা সহজে ও স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত করতে পারবেন, যা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করবে বলে আশা করা হচ্ছে।