বাংলাদেশ ডেস্ক
সংগীতকে মানুষের জীবনের দর্পণ ও সমাজবদলের হাতিয়ার বানিয়ে তোলা বিশ্ববরেণ্য শিল্পী, সুরকার ও গীতিকার ড. ভূপেন হাজারিকার আজ শততম জন্মবার্ষিকী। ১৯২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আসামের শদিয়া অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করা এই কালজয়ী শিল্পী বাংলা, অসমীয়া ও হিন্দি গানে সুদূরপ্রসারী অবদানের মাধ্যমে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় সংগীতের এক অনন্য ধারা সৃষ্টি করেছিলেন। জীবনভর মেহনতি মানুষের পক্ষে সোচ্চার থাকা এই শিল্পী ২০১১ সালের ৫ নভেম্বর জীবনাবসান ঘটে।
শিক্ষাজীবনে অত্যন্ত মেধাবী ভূপেন হাজারিকা ১৯৫২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী থাকাকালীন তিনি কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব ও শিল্পী পল রোবসনের সংস্পর্শে আসেন। রোবসনের বিখ্যাত ‘ওল ম্যান রিভার’ গানটি তার শিল্পীমানসে গভীর রেখাপাত করে। এই অনুপ্রেরণা থেকেই তিনি মিসিসিপির নদীর বেদনার সঙ্গে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকার মানুষের জীবনসংগ্রামকে যুক্ত করেন। যার ফলশ্রুতিতে সৃষ্টি হয় ‘বিস্তীর্ণ দুপারের অসংখ্য মানুষের হাহাকার শুনেও’ গানটি।
তার গানে আবহমান বাংলার ও আসামের নদীমাতৃক জনপদের খেটে খাওয়া মানুষের সুখ-দুঃখ, শোষিত মানুষের বঞ্চনা এবং সাম্যবাদের জয়গান মূর্ত হয়ে উঠেছে। ‘মানুষ মানুষের জন্য’, ‘আমি এক যাযাবর’, ‘আজ জীবন খুঁজে পাবি’, ‘গঙ্গা আমার মা’, ‘আমায় ভুল বুঝিস না’ এবং ‘হে দোলা হে দোলা’-র মতো বহু গান আজও দক্ষিণ এশিয়ার সাংস্কৃতিক পরিসরে সমান জনপ্রিয়। ২০০৬ সালে বিবিসি বাংলার পক্ষ থেকে পরিচালিত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাংলা গানের শ্রোতা জরিপে তার গাওয়া ‘মানুষ মানুষের জন্য’ গানটি দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছিল।
সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে বিভিন্ন সময়ে বহু সম্মাননা প্রদান করা হয়। ২০১৯ সালে ভারত সরকার তাকে দেশটির সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘ভারতরত্ন’ (মরণোত্তর) ভূষিত করে। কেবল সংগীত পরিবেশনই নয়, চলচ্চিত্রে সুরারোপ এবং মানবতাবাদী আদর্শ প্রচারের মধ্য দিয়ে তিনি শিল্প ও সমাজকে এক সূত্রে গেঁথেছিলেন। তার জন্মশতবার্ষিকীতে বাংলাদেশ ও ভারতের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিভিন্ন সংগঠন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। গবেষক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের মতে, ভূপেন হাজারিকার গান ও দর্শন বর্তমান সময়ের বৈষম্যমূলক সমাজে মানবতা ও সাম্যের বার্তা প্রচারে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।