আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরান ও কানাডার মধ্যে ভূরাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। কানাডার বিরুদ্ধে কৌশলগত বিভ্রান্তি ছড়ানোর জোরালো অভিযোগ তুলে দেশটির পররাষ্ট্রনীতির কঠোর সমালোচনা করেছে তেহরান। হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এবং মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যকার এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বার্তায় কানাডার ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, কানাডা একদিকে আন্তর্জাতিক আইন, শান্তি, নিরাপত্তা এবং নৌ চলাচলের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বললেও বাস্তবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ এবং তেহরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করে দ্বিমুখী নীতি অনুসরণ করছে। বাঘাই আরও অভিযোগ করেন যে, কানাডার বর্তমান নেতৃত্ব হরমুজ প্রণালির প্রকৃত বাস্তব পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে সঠিকভাবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং তারা কেবল মিত্র দেশের কৌশলগত চাপের কাছে নমনীয় অবস্থান বেছে নিয়েছে।
এর আগে কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনিতা আনন্দ এবং অর্থমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া-ফিলিপ শ্যাম্পেন এক যৌথ বিবৃতিতে ইরানের আঞ্চলিক কর্মকাণ্ড এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচলে হুমকির তীব্র নিন্দা জানান। কানাডীয় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং কৌশলগত সমুদ্রপথগুলো নিরাপদ রাখতে তেহরানের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ অব্যাহত রাখা জরুরি। সেই সঙ্গে ২০১০ সাল থেকে কানাডার নিজস্ব আইনের আওতায় প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে অটোয়া জানিয়েছে, মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে এই চাপ আরও বাড়ানো হবে।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষভাগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরুর আগ পর্যন্ত এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও নিরাপদ ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশের জলসীমায় অনুমোদনহীন বা সন্দেহজনক চলাচলের অভিযোগে বেশ কয়েকটি তেলবাহী ও অন্যান্য জাহাজে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ঘটনা ঘটে। বিশ্বের অন্যতম প্রধান এই তেল পরিবহন রুটে নিয়মিত নিরাপত্তা সংকট তৈরি হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও কানাডার এই সাম্প্রতিক কূটনৈতিক দ্বন্দ্ব কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অবনতিই নির্দেশ করে না, বরং এটি বৃহত্তর বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতার একটি অংশ। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত রাজনীতি এবং পশ্চিমা বিশ্বের নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়ে প্রধান শক্তিগুলোর দৃষ্টিভঙ্গির যে বিভাজন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও মুক্ত চলাচল নিয়ে এই টানাপোড়েন দীর্ঘায়িত হলে তা বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।