অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নিয়মানুযায়ী বার্ষিক আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় কেবল আয় ও সম্পদের বিবরণী প্রদান করাই যথেষ্ট নয়, এর পাশাপাশি জীবনযাত্রার বিভিন্ন খাতের ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাবও দাখিল করতে হয়। একজন করদাতা সারা বছরে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছেন এবং সেই ব্যয় তার ঘোষিত আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাই করতেই এসব তথ্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, করদাতাদের আইটি ১১গ ফরমের মাধ্যমে জীবনযাপন-সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের এই বিবরণী প্রদান করতে হয়, যা স্বচ্ছ ও সঠিক কর নির্ধারণ প্রক্রিয়ার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
রিটার্নে জীবনযাত্রার ব্যয়ের জন্য নির্দিষ্ট কিছু খাত নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পরিবারের ভরণপোষণ বা সংসারের দৈনন্দিন খরচ। বাজারসদাইসহ পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণ বাবদ সারা বছরে মোট কত টাকা ব্যয় হয়েছে, তার একটি সুনির্দিষ্ট হিসাব দিতে হয়। এটি মাসিক নয়, বরং পুরো বছরের সম্মিলিত ব্যয়ের হিসাব হিসেবে দেখাতে হয়। এছাড়া বাসাভাড়া ও আবাসন রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ বার্ষিক খরচের তথ্যও অপরিহার্য। নিজের বাড়ি হলে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ এবং ভাড়া বাসায় থাকলে পরিশোধিত ভাড়ার সঠিক পরিমাণ উল্লেখ করতে হয়। এর মাধ্যমে করদাতার আয়ের সঙ্গে তার আবাসন ব্যবস্থার যৌক্তিকতা যাচাই করা সম্ভব হয়।
ব্যবহৃত যানবাহনের খরচও জীবনযাত্রার ব্যয়ের একটি বড় খাত। করদাতার কোনো প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তিগত যানবাহন থাকলে সেটির পেছনে সারা বছরের জ্বালানি খরচ, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, বিভিন্ন মাশুল এবং চালকের বেতনসহ সংশ্লিষ্ট সকল খরচ হিসাব করতে হয়। পাশাপাশি গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, টেলিফোন, মোবাইল ও ইন্টারনেটের মতো নিয়মিত ইউটিলিটি বিলের বার্ষিক হিসাবও এই ফরমের অন্তর্ভুক্ত। সন্তানদের পড়াশোনার ক্ষেত্রে স্কুল-কলেজের টিউশন ফি, কোচিং বা শিক্ষা উপকরণের মতো ব্যয়গুলোও সঠিকভাবে উল্লেখ করতে হয়। করদাতার ঘোষিত আয়ের তুলনায় শিক্ষাব্যয় অস্বাভাবিক বেশি হলে তার উৎস নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ থাকে, তাই এসব খাতের হিসাব অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
এর বাইরেও দেশ ও দেশের বাইরে ভ্রমণ বাবদ খরচ রিটার্নে প্রদর্শন করতে হয়। ক্রেডিট কার্ড বা অন্য কোনো মাধ্যমে ভ্রমণকালে যে অর্থ ব্যয় হয়, তার বিবরণও এতে যুক্ত থাকে। ঈদ, পূজা কিংবা অন্যান্য জাতীয় ও সামাজিক উৎসবে পোশাক কেনাকাটা, আত্মীয়স্বজনকে উপহার বা নগদ অর্থ প্রদানসহ উৎসবকেন্দ্রিক খরচের হিসাবও জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত করতে হয়। পাশাপাশি বছরজুড়ে বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে যে উৎসে কর কেটে রাখা হয়েছে, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর কর্তিত কর, পূর্ববর্তী বছরের রিটার্নের ভিত্তিতে পরিশোধিত আয়কর এবং সারচার্জের পরিমাণও সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে গৃহীত কোনো ঋণের বিপরীতে পরিশোধিত সুদের পরিমাণও এই বিবৃতির বাইরে নয়।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জীবনযাত্রার ব্যয়ের এসব তথ্য মূলত করদাতার প্রকৃত আয় এবং ব্যয়ের মধ্যকার সামঞ্জস্য মূল্যায়নের জন্য অত্যন্ত কার্যকরী। একজন ব্যক্তি যে পরিমাণ আয় প্রদর্শন করছেন, তার জীবনযাত্রার মান ও ব্যয় তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কি না, তা এসব তথ্যের মাধ্যমে যাচাই করেন কর কর্মকর্তারা। অসংগতিপূর্ণ বা অবাস্তব তথ্য করদাতাকে আইনি জটিলতা বা অডিট বা মূল্যায়নের মুখোমুখি করতে পারে। তাই আয়কর রিটার্ন প্রস্তুত করার সময় সারা বছরের প্রতিটি খাতের ব্যয়ের হিসাব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সংরক্ষণ করা উচিত। এতে রিটার্নে সঠিক ও নির্ভুল তথ্য প্রদান করা সহজ হয় এবং করদাতার আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে স্বচ্ছতা ও সামঞ্জস্য উভয়ই বজায় থাকে।