আন্তর্জাতিক ডেস্ক
গাজায় অব্যাহত সংঘাত ও ব্যাপক প্রাণহানির ফলে মৃতদের দাফন ও শেষ বিদায় জানানোর ক্ষেত্রে নজিরবিহীন সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। একের পর এক কবরস্থান পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় এবং নতুন জায়গা নির্ধারণের সুযোগ না থাকায় ফিলিস্তিনিদের বাধ্য হয়ে পুরোনো কবর পুনরায় ব্যবহার করতে হচ্ছে। যুদ্ধ ও অবরোধের কবলে পড়ে গাজার প্রথাগত দাফন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, যা বর্তমান মানবিক বিপর্যয়কে আরও ঘনীভূত করেছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সংঘাতের জেরে গাজায় ৪০টিরও বেশি কবরস্থান সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়েছে। এর পাশাপাশি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলোতে কবরস্থানে প্রবেশের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ফলে পরিবারগুলো তাদের স্বজনদের মরদেহ যথাযথভাবে দাফন করতে চরম বিপাকে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে জায়গার অভাবে এবং প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রীর তীব্র সংকটের কারণে ধ্বংসস্তূপের ইট-পাথর, কাদামাটি কিংবা ঢেউটিন দিয়ে অস্থায়ী কবর তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে কেবল একটি পাথরের টুকরো বা কাগজে লেখা নাম দিয়ে চিহ্ন রাখা হচ্ছে।
গাজার ধর্মীয় বিষয়ক ও ওয়াক্ফ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, সংঘাত শুরুর আগেই এই অঞ্চলের অনেক কবরস্থান ধারণক্ষমতার শেষ সীমায় পৌঁছেছিল। চলমান পরিস্থিতিতে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক নিহতের সংখ্যা যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নিয়েছে। কবর তৈরির খরচও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। পাথর ও উপকরণের অভাবে বর্তমানে একটি সাধারণ দাফন সম্পন্ন করতে ৭০০ থেকে এক হাজার শেকেল পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে, যা যুদ্ধবিধ্বস্ত সাধারণ মানুষের পক্ষে বহন করা অসম্ভব। ফলে অনেকেই পূর্বপুরুষের কবরে বা দাদার কবরেই নতুন মরদেহ দাফন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
শুধু কবরস্থান নয়, দাফন প্রক্রিয়াতেও ব্যাপক বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তীব্র সংঘাতের মুখে নিরাপদ দাফনের সুযোগ না পেয়ে মানুষ বাড়ির আঙিনায়, তাঁবুর পাশে, আশ্রয়শিবির, স্কুল কিংবা হাসপাতালের চত্বরে মরদেহ দাফন করতে বাধ্য হয়েছেন। যুদ্ধবিরতি এবং সাময়িক বিরতির সুযোগে বিভিন্ন গণকবর ও অস্থায়ী স্থান থেকে শত শত মরদেহ উদ্ধার করে পুনরায় কবরস্থানে স্থানান্তরের কাজ চলছে। তবে এই পুরো প্রক্রিয়ার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালার প্রয়োজন রয়েছে, যা বর্তমান যুদ্ধপরিস্থিতিতে অত্যন্ত দুরূহ হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গাজার এই সংকট কেবল জীবিতদের বাস্তুচ্যুতি ও বেঁচে থাকার লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি মৃতদের সম্মানজনক অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও অধিকারকেও হরণ করেছে। কবরস্থানের স্বল্পতা, অবকাঠামোগত ধ্বংস এবং উপকরণের অভাব দূর করা না গেলে সামনের দিনগুলোতে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মানবিক সংকট আরও মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। গাজার ওয়াক্ফ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এই পরিস্থিতি সামাল দিতে নতুন জায়গার সন্ধান এবং সুশৃঙ্খল দাফন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।