অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও প্রবাসী আয়ে ইতিবাচক প্রবাহ বজায় রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশের মোট বা গ্রস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন (৩ হাজার ৬৫৯ কোটি ২৬ লাখ) মার্কিন ডলারে। একই সঙ্গে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আগস্ট মাসের প্রথম তিন দিনে (১ থেকে ৩ আগস্ট) দেশে প্রবাস আয় বা রেমিট্যান্স এসেছে ৪০৬ মিলিয়ন বা ৪০ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার, যা বিগত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৮৪ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বর্তমানে দেশের মোট বা গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬,৫৯২ দশমিক ৬৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৩৬ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাবপদ্ধতি ‘ব্যালান্স অব পেমেন্টস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পজিশন ম্যানুয়াল’ (বিপিএম-৬) অনুযায়ী রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩১,৭৭৬ দশমিক ২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৩১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি বৈদেশিক লেনদেনে গতি আসায় রিজার্ভের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আগস্টের সূচনাতেই প্রবাসীদের আয় পাঠানোর গতি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি মাসের প্রথম তিন দিনেই ৪০৬ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। গত অর্থবছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ২২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। কেবল ৩ আগস্ট এক দিনেই ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে এসেছে ১৩৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরু থেকেই রেমিট্যান্স প্রবাহে বলিষ্ঠ গতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত ১ জুলাই থেকে ৩ আগস্ট পর্যন্ত দেশে মোট ৩ দশমিক ২৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। পূর্ববর্তী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে এ আয়ের পরিমাণ ছিল ২ দশমিক ৬৯৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সে হিসাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৩ আগস্ট পর্যন্ত রেমিট্যান্স প্রবাহে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা এবং হুন্ডি প্রতিরোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গৃহীত নীতিগত পদক্ষেপ প্রবাসীদের আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করছে। এর ফলে দেশের ব্যাংকিং খাত ও বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে ডলারের তারল্য সরবরাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা দেশের মোট রিজার্ভ ভিত্তি পুনর্গঠনে প্রধান ভূমিকা রাখছে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, জ্বালানি তেল, সার এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানির দায় পরিশোধ সহজতর করতে বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী রিজার্ভের এই প্রবৃদ্ধি অত্যন্ত ইতিবাচক। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে, একটি দেশের অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ হিসেবে থাকা আবশ্যক। বর্তমানের এই রিজার্ভ দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য পরিশোধের সক্ষমতাকে নিরাপদ সীমার মধ্যে রাখছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রেমিট্যান্স প্রবাহের এই ইতিবাচক ধারা বজায় থাকলে দেশের বৈদেশিক খাতের ওপর চলমান চাপ লাঘব হবে। একই সাথে ব্যাংকগুলোতে ব্যাংকিং তারল্য বৃদ্ধি পাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে টাকার মান বজায় রাখা সম্ভব হবে। রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রবাসীদের জন্য ব্যাংকিং সুবিধা সহজীকরণ এবং ধারাবাহিক তদারকি বজায় থাকলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ভবিষ্যতে আরও সুসংহত রূপ নেবে।