জাতীয় ডেস্ক
আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের দেশে ফেরার সাম্প্রতিক বার্তা ও রাজনৈতিক তৎপরতার কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ও রাজনৈতিক ইতিহাস তুলে ধরে রাজপথে প্রতিরোধের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। রাজধানীর একটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি স্পষ্ট করেন যে, বিগত সরকারের সময়ে সংঘটিত অন্যায়, খুন, গুম ও অর্থ পাচারের মতো অপরাধের জন্য দলটির মাঝে কোনো অনুশোচনা দেখা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘তারা বলে ডিসেম্বর মাসে দেশে আসবে। আমরা অপেক্ষা করে আছি। দেশে আসুক, ইনশাআল্লাহ রাজপথে দেখা হবে।’
বুধবার (০৫ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের সম্মানার্থে এক সংবর্ধনা ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিয়ে তিনি এই বক্তব্য প্রদান করেন। ভারতের আশ্রয়ে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও দলের নেতাকর্মীদের সাম্প্রতিক প্রচারণার দিকে ইঙ্গিত করে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ঐতিহাসিক বিভিন্ন অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার পর তাদের কোনো লজ্জাবোধ দৃশ্যমান নয়।
নিজের সামরিক ও রাজনৈতিক জীবনের প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে ৮২ বছর বয়সী এই বীর মুক্তিযোদ্ধা দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ২৭ বছর বয়সে তিনি দেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষায় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। বর্তমানে প্রবীণ বয়সে এসেও দেশের সার্বিক সুরক্ষা ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনে রাজপথে আরেকটি লড়াই বা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে তিনি প্রস্তুত আছেন।
জুলাই ও আগস্টের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে জীবন উৎসর্গকারী শহীদদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, গণঅভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো এবং আহতদের উন্নত চিকিৎসা ও সামগ্রিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করাই বর্তমানে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার ও মৌলিক দায়িত্ব। দেশের বিদ্যমান সব আর্থিক ও প্রশাসনিক সামর্থ্য কাজে লাগিয়ে শহীদ পরিবার ও আহতদের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
গণতন্ত্র ও দেশের জাতীয় সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার প্রসঙ্গে তিনি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের তুলনা টানেন। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ ছিল মূল বৈষম্যের বিরুদ্ধে জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। একইভাবে চব্বিশের এই গণআন্দোলনও ছিল মূলত জনগণের ভোটাধিকার এবং গণতন্ত্র পুনর্বাসনের লড়াই। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনকে গণতান্ত্রিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানান, সাধারণ মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত থাকলে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বিক সার্বভৌমত্ব চিরকাল অক্ষুণ্ন থাকবে। রাজনৈতিক বা মতাদর্শিক বৈচিত্র্য থাকা স্বাভাবিক হলেও দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষায় সব রাজনৈতিক শক্তি ও নাগরিককে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকার আকুল আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে, অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাস নিয়ে প্রস্তুতকৃত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। প্রামাণ্যচিত্রে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রথম সারির শহীদ আবু সাঈদ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছবি অন্তর্ভুক্ত না থাকায় দর্শকসারিতে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর জেরে অনুষ্ঠানস্থলে হট্টগোল ও কিছু সময় বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। আয়োজকরা তাৎক্ষণিকভাবে এই ভুল স্বীকার করে উপস্থিত সবার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করার পরও বিশৃঙ্খলা অব্যাহত থাকে।
রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষ্ঠানে এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ। অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক ক Diplomat ও বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, বৈদেশিকের সামনে এমন ঘটনা জাতীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। রাষ্ট্রীয় প্ল্যাটফর্মে স্লোগান দেওয়া বা ‘ভুয়া ভুয়া’ ধ্বনি তোলার রাজনৈতিক সংস্কৃতি সুস্থ ধারার প্রতিনিধিত্ব করে না বলেও তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।