বিশেষ প্রতিবেদক
সাবেক আইন উপদেষ্টা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, হাজারো মানুষকে হত্যা এবং অসংখ্য মানুষকে পঙ্গু করে দেওয়ার বিচার নিশ্চিত না হলে প্রয়োজনে আবারও রাজপথে নামবে দেশের সাধারণ মানুষ ও রাজপথের আন্দোলনকারীরা। তিনি স্পষ্ট করেন যে, শেখ হাসিনার বিচার ও দেশে তার প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে ছাত্র-জনতার ঐক্যে কোনো ফাটল ধরবে না এবং যেকোনো মূল্যে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের চেতনা অক্ষুণ্ন রাখা হবে।
বুধবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক দীর্ঘ বার্তায় তিনি এসব কথা বলেন। এতে সাবেক এই উপদেষ্টা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, আওয়ামী লীগের শাসনব্যবস্থার প্রকৃতি, দলটির ভুলভ্রান্তি এবং দেশের রাজনৈতিক ভবিষৎ নিয়ে নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ও কঠোর মতামত তুলে ধরেন।
প্রকাশিত বার্তায় আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক ভূমিকা ও রাজনৈতিক পরিণতির বিশ্লেষণ করে অধ্যাপক আসিফ নজরুল উল্লেখ করেন, স্বাধীনতা যুদ্ধে আওয়ামী লীগের অবদান অনস্বীকার্য হলেও পরবর্তীতে তাদের অনাচার ও চরম স্বৈরাচারী আচরণের কারণেই দেশের জনগণ দু’বার তাদের ক্ষমতা থেকে উৎখাত করেছে। ১৯৭৫ পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কীভাবে একটি বিশাল রাজনৈতিক দল জনতার রোষাণলে পড়ে সমূলে উৎখাত হয়, সে বিষয়ে তাদের নিজস্ব আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। কিন্তু অহংবোধের কারণে আওয়ামী লীগ তা কখনো করবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সিনিয়র শিক্ষক আরও উল্লেখ করেন, ক্ষমতার অতিরিক্ত অপব্যবহার ও বাকশালীয় মানসিকতাই ছিল আওয়ামী লীগের মূল সংকট। দলটি ঐতিহাসিক ধানমন্ডি ৩২ নম্বরকে সম্পূর্ণ বাংলাদেশ এবং একটি নির্দিষ্ট পরিবারকে দেশের একমাত্র মালিক মনে করার ভুল আদর্শ লালন করেছে। পাশাপাশি মহান মুক্তিযুদ্ধকে তারা ভিন্নমত দমনের লাইসেন্স হিসেবে ব্যবহার করেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। এই ধরণের দৃষ্টিভঙ্গিই তাদেরকে যুগে যুগে ব্যাপক জুলুম, অন্যায় ও অনাচার চালানোর দুঃসাহস জুগিয়েছে।
দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলের বিষয়ে মন্তব্য করে ড. আসিফ নজরুল বলেন, বাংলাদেশের অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নানা সীমাবদ্ধতা ও ভুলত্রুটি থাকতে পারে। তবে কোনো দলই আওয়ামী লীগের মতো চরম অনাচার, ক্ষমতার মালিকানাবোধ বা সীমাহীন স্পর্ধা দেখায়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিভিন্ন রাজনৈতিক আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নেতাকর্মীদের এসব প্রত্যাশায় বাস্তবে কোনো ফল আসবে না। গণঅভ্যুত্থানকালীন সময়ে শিশু, তরুণ ও সাধারণ মানুষের ওপর পরিচালিত নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচার না হওয়া পর্যন্ত দেশে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের সুযোগ নেই। আন্দোলনকারীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে নামার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি জানান, তরুণদের ওপর গুলি চালানো কোনো খুনিকে দেশের মানুষ কখনো ক্ষমা করবে না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে বাংলাদেশের পুনর্জন্ম হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি মতপার্থক্য ভুলে এক থাকার আহ্বান জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতাচ্যুতির পর আওয়ামী লীগের পুনর্গঠন কিংবা বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে সরকারের অবস্থান এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন হতে পারে— আসিফ নজরুলের এই বক্তব্য তারই একটি জোরালো রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করে।