অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, বিনিয়োগ সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বহুল আলোচিত সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা) চূড়ান্তকরণের লক্ষ্য নিয়ে আজ সোমবার (০৩ আগস্ট) ঢাকায় পৌঁছেছেন দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্য, শিল্প ও সম্পদমন্ত্রী কিম জং-ক্বান। উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের আসন্ন উত্তরণের প্রেক্ষাপটে এ সফরকে দুই দেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, সফরে কিম জং-ক্বান বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও নীতিপ্রণেতাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সংলাপে অংশ নেবেন। সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি দেশীয় শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন এবং দক্ষিণ কোরীয় বিনিয়োগকারীদের সঙ্গেও তাঁর পৃথক বৈঠকের কথা রয়েছে। এসব আলোচনায় দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সহজীকরণ এবং বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসের মতো মৌলিক বিষয়গুলো প্রাধান্য পাবে।
দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মূল কেন্দ্রে থাকবে উভয় দেশের মধ্যকার প্রস্তাবিত সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা)। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই চুক্তি সংক্রান্ত আলোচনার অংশ হিসেবে গত জুলাইয়ে সিউলে পঞ্চম দফার বৈঠক সফলভাবে সম্পন্ন হয়। চলমান এ কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় দুই দেশের ব্যবসায়িক স্বার্থ সুরক্ষায় এবং বাজার সুবিধা বাড়াতে চুক্তি চূড়ান্ত করার কাছাকাছি পৌঁছেছে উভয় পক্ষ। প্রস্তাবিত চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে তা বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
সফরকালে দক্ষিণ কোরিয়া ও বাংলাদেশের আলোচনায় বেশ কয়েকটি উদীয়মান ও গুরুত্বপূর্ণ খাত গুরুত্বের শীর্ষে রয়েছে। এর মধ্যে ঐতিহ্যবাহী তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাত ছাড়াও ইলেকট্রনিক্স, তথ্য-প্রযুক্তি, বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ, নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন খাত অন্যতম। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছ থেকে উচ্চপ্রযুক্তি স্থানান্তর, ইলেকট্রনিক্স ও প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশি তরুণ জনশক্তির কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে গুরুত্ব আরোপ করবে ঢাকা।
২০২৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তর ঘটবে বাংলাদেশের। উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ বিভিন্ন উন্নত বাজারে বর্তমানে বিদ্যমান শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা হারাতে পারে। ফলে রূপান্তরকালীন এই ঝুঁকি কাটিয়ে উঠতে বাণিজ্য কাঠামোর আধুনিকায়ন এবং কৌশলগত দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সম্পাদন জরুরি হয়ে পড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গভীর করা গেলে তা বাংলাদেশের জন্য নতুন ও দীর্ঘমেয়াদি বাজার উন্মুক্ত করবে এবং সামগ্রিক রপ্তানি বাণিজ্যকে বহুমুখী করতে সহায়তা জোগাবে।
দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের অন্যতম প্রধান নির্ভরযোগ্য সঙ্গী হিসেবে কাজ করে আসছে। দেশটির অসংখ্য বহুমুখী প্রতিষ্ঠান বর্তমানে বাংলাদেশে ম্যানুফ্যাকচারিং, ইপিজেড, টেক্সটাইল ও রপ্তানিমুখী বিভিন্ন সংবেদনশীল খাতে ব্যবসা পরিচালনা করছে। তা সত্ত্বেও দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে এখনো বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। ঢাকা সফরকালে এ বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা এবং বাংলাদেশি পণ্যের কোরীয় বাজারে নিরবচ্ছিন্ন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার জোর দাবি তোলা হবে। দক্ষিণ কোরীয় বাণিজ্যমন্ত্রীর এই সফর কেবল দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতাই বাড়াবে না, বরং এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী বাণিজ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অঙ্গনে এক ধাপ এগিয়ে রাখবে বলে মনে করছেন বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা।