বিশেষ প্রতিবেদক
দেশের স্পর্শকাতর ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধি রোধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক সমন্বিত ডেটা বিশ্লেষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, আমদানিনির্ভরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে দ্রুততম সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে এ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ই-কমার্স বাস্তবায়ন বিষয়ক এক পর্যালোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এই তথ্য নিশ্চিত করেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় সংশ্লিষ্ট খাতের অন্যান্য দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, দেশের বাজার ব্যবস্থাপনায় অনেক সময় পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে অথবা সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় পণ্য সরবরাহে সংকট তৈরি হয়। পেঁয়াজ, ডালসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের ঘাটতি মূলত স্থানীয় উৎপাদন হ্রাস, মৌসুমি প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভর করে। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের উৎপাদন বা আমদানি উৎসে জটিলতা দেখা দিলে স্থানীয় বাজারে হঠাৎ করে বড় ধরনের সরবরাহ ঘাটতি দেখা দেয়। এর ফলে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়, যা নিয়ন্ত্রণে আনা সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়।
মন্ত্রী স্পষ্ট জানান, আন্তর্জাতিক বা স্থানীয় কারণে পণ্যের দাম বাড়লে সরকার সেখানে ভর্তুকি প্রদান করবে কি না, সেটি নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। তবে কোনো অবস্থাতেই যাতে সরবরাহ বন্ধ হয়ে বাজারে কৃত্রিম বা বাস্তব সংকট তৈরি না হয়, সে নিশ্চিত করাই বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য। এই লক্ষ্য অর্জনে আগে থেকেই পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য প্রযুক্তিভিত্তিক স্থায়ী সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছে।
ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন নতুন এই প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মটি বিগত ১০ বছরের বাজার পরিক্রমা, স্থানীয় উৎপাদন, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি এবং আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত বিস্তৃত তথ্য বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হবে। বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের তথ্য সংগ্রহ এবং তা বিশ্লেষণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা আয়োজন করতে হয়। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে যে সময় অপচয় হয়, এআইভিত্তিক প্রযুক্তি চালু হলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেই নির্ভুল বিশ্লেষণ পাওয়া সম্ভব হবে।
এই প্রযুক্তি আগাম সতর্কবার্তা দিয়ে জানাবে বছরে কখন এবং কোন পণ্যের ঘাটতি হতে পারে। পাশাপাশি, বিশ্ববাজারের কোন দেশ থেকে পণ্য আমদানি সুবিধাজনক হবে, আন্তর্জাতিক রপ্তানিকারক দেশগুলোর বিদ্যমান সক্ষমতা কেমন এবং কোন সময়ে ক্রয়াদেশ দিলে তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য পাওয়া যাবে—তা সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরবে।
এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এককভাবে এই প্রযুক্তি পরিচালনা করবে না; বরং কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সংস্থাকে সঙ্গে নিয়ে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক গঠন করা হবে। যুক্ত থাকা অন্যান্য সংস্থাসমূহ তাদের নিজস্ব নীতি নির্ধারণে এই প্রযুক্তিগত ডেটাবেজ ব্যবহারের সুযোগ পাবে।
ব্যবস্থাটির সর্বোচ্চ কার্যকারিতা নিশ্চিত করার জন্য নির্ভুল ডেটা সোর্সের সংস্থান করার বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। সরকারি তথ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ওপেন সোর্স ও সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক বিশ্বস্ত তথ্য কাঠামো একত্রিত করে একটি আন্তর্জাতিক মানের ডেটাবেজ গড়ে তোলা হবে। প্রাথমিক অবস্থায় এ ব্যবস্থা চালুর জন্য খানিকটা সময় লাগলেও পরবর্তীতে এটি মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার চেয়ে অত্যন্ত দ্রুত ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে বলে সভায় আশা প্রকাশ করা হয়।