জাতীয় ডেস্ক
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই নিহতদের স্মরণে আজ বৃহস্পতিবার দেশব্যাপী ‘জুলাই শহীদ দিবস’ পালিত হচ্ছে। বৈষম্যবিরোধী ওই ছাত্র আন্দোলনে প্রথমবারের মতো এক দিনে প্রাণহানির এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরবর্তী সময়ে দিনটিকে সরকার ‘জুলাই শহীদ দিবস’ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে। আজ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শোক দিবস পালনের মাধ্যমে দেশের জন্য প্রাণ দেওয়া ওই শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হচ্ছে।
সরকারি নির্দেশনার অংশ হিসেবে আজ সারা দেশে সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সব সরকারি ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোতেও একই কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। শহীদদের আত্মার শান্তি ও মাগফিরাত কামনা করে আজ বাদ জোহর দেশের সকল মসজিদে বিশেষ দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। এর পাশাপাশি দেশের অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতেও তাদের স্মরণে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রীয়ভাবে বেশ কিছু স্মৃতিচারণমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আজ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত শিক্ষার্থী আবু সাঈদের স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। অন্যদিকে, চট্টগ্রামে নিহত চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ও কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ওয়াসিম আকরামের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কক্সবাজারের পেকুয়ায় তার সমাধিস্থলে যাবেন প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। এছাড়া তিনি চট্টগ্রামের মুরাদপুরে ওয়াসিমের নিহত হওয়ার স্থানে আরও একটি স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। এই স্মৃতিস্তম্ভগুলোর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস ও শহীদদের আত্মত্যাগ তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় আয়োজনের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও দিনটি উপলক্ষে স্মরণ সভা ও শোক র্যালির আয়োজন করেছে।
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও ১৬ জুলাইয়ের ঘটনা
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের পরিপত্র হাইকোর্ট কর্তৃক অবৈধ ঘোষণার পর ২০২৪ সালের জুন মাসের শুরু থেকে শিক্ষার্থীরা পুনরায় মেধাভিত্তিক নিয়োগের দাবিতে মাঠে নামেন। প্রথমদিকে এই আন্দোলনটি দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ থাকলেও, জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে এসে তা সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৬ জুলাই দেশব্যাপী ব্যাপক সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। ওই দিন রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের মুখোমুখি অবস্থানে থাকাকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। নিরস্ত্র একজন শিক্ষার্থীর ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন গুলিবর্ষণের দৃশ্য সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা দেশব্যাপী তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করে। বিশ্লেষকদের মতে, আবু সাঈদের মৃত্যুর ঘটনাটি ছিল সম্পূর্ণ আন্দোলনের একটি মনস্তাত্ত্বিক টার্নিং পয়েন্ট, যা সাধারণ মানুষের আবেগকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল এবং আন্দোলনের গতিপথকে স্থায়ীভাবে ত্বরান্বিত করেছিল।
একই দিনে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ব্যাপক সংঘর্ষে আরও পাঁচজনের প্রাণহানি ঘটে। চট্টগ্রামে নিহত হন ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরাম, এমইএস কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমদ শান্ত এবং স্থানীয় একটি ফার্নিচার দোকানের কর্মচারী মোহাম্মদ ফারুক। অন্যদিকে ঢাকায় নিহত হন নিউমার্কেট এলাকার হকার মো. শাহজাহান এবং নীলফামারীর যুবক সবুজ আলী। ১৬ জুলাইয়ের ওই ঘটনায় সারা দেশে মোট ছয়জন নিহত হন এবং অসংখ্য ছাত্র-জনতা আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন।
আন্দোলনের মোড় পরিবর্তন ও চূড়ান্ত পরিণতি
১৬ জুলাইয়ের প্রাণহানির ঘটনার পর কোটা সংস্কার আন্দোলন আর কেবল বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চশিক্ষার শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা সারা দেশে একটি সর্বাত্মক গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সর্বস্তরের জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে আসেন। দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক-মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধের কারণে দেশব্যাপী যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় অচল হয়ে পড়ে। একদিকে সমগ্র দেশের ছাত্র-জনতা এবং অন্যদিকে তৎকালীন সরকার, তাদের সমর্থক গোষ্ঠী ও প্রশাসন মুখোমুখি অবস্থানে চলে যায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে তৎকালীন সরকার দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। একই সঙ্গে আন্দোলন দমাতে দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়। কিন্তু ব্যাপক ধরপাকড় ও দমনপীড়নের মাধ্যমেও এই আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। বরং শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন ক্রমশ ছাত্র-জনতার সম্মিলিত এক দফা দাবিতে রূপান্তরিত হয়—যা ছিল তৎকালীন সরকারের পদত্যাগ।
টানা কয়েক সপ্তাহের তুমুল বিক্ষোভ, সংঘাত ও রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত পর্যায়ে ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের একটি রাজনৈতিক সরকারের পতন ঘটে। আজকের এই দিনে পালিত হওয়া ‘জুলাই শহীদ দিবস’ মূলত সেই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। দেশের গণতান্ত্রিক চর্চা ও অধিকার আদায়ের ইতিহাসে ১৬ জুলাইয়ের শহীদদের এই আত্মত্যাগ একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।