অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক
চলতি ২০২৬ সালের জুলাই মাসের প্রথম ১৪ দিনে প্রবাসীরা দেশে ১৫৪ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এই ধারা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যে দেখা গেছে, গত বছরের জুলাই মাসের প্রথম ১৪ দিনে রেমিট্যান্স এসেছিল ১২৬ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার। সেই হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে এই খাতে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ২১ দশমিক ৮০ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাই মাসের শুরু থেকেই রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক গতি লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে এসে এই প্রবাহ আরও বেগবান হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শুধুমাত্র জুলাই মাসের ১৪ তারিখেই প্রবাসীরা ১১ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। একক দিনের এই আয় চলতি মাসের রেমিট্যান্স সংগ্রহের গতিকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিট্যান্সের এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দেশের অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোর মধ্যে রেমিট্যান্স অন্যতম, যা আমদানির দায় মেটাতে এবং মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। বিশেষ করে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে এই প্রবাহের গুরুত্ব অপরিসীম।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর বিষয়ে প্রবাসীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নানাবিধ উদ্যোগের ফলে এই ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর উৎসাহিত করতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন সময় প্রণোদনা ও ব্যাংকিং সেবাকে আরও সহজতর করেছে। এর ফলে হুন্ডি বা অবৈধ পথে টাকা পাঠানোর প্রবণতা কিছুটা হলেও কমেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এই উচ্চ প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে শ্রমবাজারের পরিস্থিতির ওপর রেমিট্যান্স প্রবাহ অনেকাংশেই নির্ভরশীল। যেহেতু বাংলাদেশের সিংহভাগ রেমিট্যান্স মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আসে, তাই সেসব দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও শ্রমবাজারের পরিস্থিতির ওপর আমাদের নজর রাখা জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রেমিট্যান্স প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং হুন্ডির অপতৎপরতা রুখতে তদারকি বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও প্রবাসীদের সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে আরও তৎপর রয়েছে, যা বৈধ পথে অর্থ প্রেরণের সিদ্ধান্তকে আরও জনপ্রিয় করছে।
উল্লেখ্য, গত কয়েক মাস ধরেই দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহে একটি ইতিবাচক ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যদি এই গতিধারা জুলাই মাসজুড়ে অব্যাহত থাকে, তবে মাসের শেষে রেমিট্যান্সের পরিমাণ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আরও বড় ব্যবধানে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশের অর্থনীতির বহিস্থ খাতের চাপ কমাতে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের মজুত সন্তোষজনক অবস্থানে নিয়ে আসতে এই রেমিট্যান্স প্রবাহ একটি কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, জুলাই মাসের প্রথম দুই সপ্তাহের এই তথ্য বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা। বিশ্ববাজারে মুদ্রাস্ফীতি এবং ডলার সংকটের মতো বৈশ্বিক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও রেমিট্যান্সের এই প্রবাহ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। আগামী দিনগুলোতে এই ধারা বজায় রাখতে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সমন্বিত উদ্যোগ ও নীতি সহায়তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা প্রয়োজন।