অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়ে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা থাকা সত্ত্বেও বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা)। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংস্থাটি ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৭১৭ দশমিক ৭১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব পেয়েছে। এই বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে দেশে প্রায় ৭৫ হাজার ৭৪৪ জনের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
বেপজার তথ্য অনুযায়ী, আলোচ্য অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানি ছিল ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বেপজার আওতাধীন শিল্পাঞ্চলগুলো থেকে ৮ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা দেশের মোট রপ্তানির ১৭ দশমিক ৫১ শতাংশ। আগের অর্থবছরে এই রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৮ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার। ফলে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়ে শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ ঘাটতি থাকলেও বেপজা অঞ্চল থেকে রপ্তানি ২ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিনিয়োগের এই রেকর্ড গড়ার পেছনে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সামোয়া এবং স্থানীয়সহ মোট ৩৬টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। এসব নতুন বিনিয়োগের একটি বড় অংশ প্রচলিত তৈরি পোশাক খাতের বাইরের বহুমুখী পণ্য উৎপাদন শিল্পে যুক্ত হচ্ছে। এর মধ্যে ব্যাগ ও লাগেজ, ফ্যাশন অ্যাকসেসরিজ, বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্য, স্মার্ট গ্যাজেট, ড্রোন প্রযুক্তি, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, কৃষিপণ্য, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ক্যাম্পিং ফার্নিচারের মতো পণ্য উল্লেখযোগ্য। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই বৈচিত্র্যময় পণ্য উৎপাদন বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুড়িকে আরও শক্তিশালী করবে।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ার বিষয়ে বেপজা জানিয়েছে, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং বিনিয়োগবান্ধব সেবা নিশ্চিত করায় বিদ্যমান বিনিয়োগকারীরাও তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। উদাহরণস্বরূপ, কাইশি গ্রুপের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে তাদের বিনিয়োগের পরিধি ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি করছে, যা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নতুন করে আশ্বস্ত করছে।
সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণেও বেপজা ধারাবাহিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংস্থাটির আওতাধীন অঞ্চলগুলোতে ২৮৬ দশমিক ৪৬ মিলিয়ন ডলারের প্রকৃত বিনিয়োগ হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) দেশের মোট এফডিআই নেট ইনফ্লোর ১৯ দশমিক ৬১ শতাংশ এসেছে শুধুমাত্র বেপজা অঞ্চল থেকে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টির দিক থেকেও অর্থবছরটি বেপজার জন্য অত্যন্ত সফল। আলোচ্য সময়ে ২৫ হাজার ১৬৪ জন বাংলাদেশির নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে। এর ফলে ২০২৬ সালের জুন শেষে বেপজার আওতাধীন শিল্পাঞ্চলগুলোতে মোট কর্মসংস্থানের সংখ্যা ৫ লাখ ৫৮ হাজার ৬৯১ জনে দাঁড়িয়েছে, যা সংস্থাটির ইতিহাসের সর্বোচ্চ।
বর্তমানে বেপজার অধীনে আটটি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড) এবং একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিচালিত হচ্ছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মোট ৫৬৬টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪৫১টি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে রয়েছে এবং বাকি ১১৫টি বাস্তবায়নাধীন পর্যায়ে রয়েছে। বাণিজ্যিক উৎপাদনে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বর্তমানে ৪১ শতাংশই তৈরি পোশাক শিল্পের বাইরের বহুমুখী পণ্য উৎপাদন করছে, যা বাংলাদেশের শিল্পের কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। উৎপাদিত এসব পণ্য বিশ্বের ১২৯টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে সুসংহত করছে।
২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত বেপজার আওতাধীন অঞ্চলে পুঞ্জীভূত বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং মোট রপ্তানি হয়েছে ১২৭ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিনিয়োগের এই ইতিবাচক ধারা বজায় থাকলে তা দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্পায়নে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।