অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
ইরানের সামরিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম টানা চতুর্থ দিনের মতো ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ চড়ায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের মূল্য ৩৩ সেন্ট বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৫ দশমিক ২৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ৪২ সেন্ট বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮০ দশমিক ০২ ডলারে লেনদেন হচ্ছে। গত মঙ্গলবার তেলের দাম এক মাসের সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছানোর পর থেকেই ঊর্ধ্বমুখী ধারার এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মূলত সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্নিত হওয়ার আতঙ্কে বিনিয়োগকারীরা তেল মজুত করার দিকে ঝুঁকছেন।
বুধবার ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ আরোপ এবং দেশটির উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। এই সামরিক পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় ইরান তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তেহরান সতর্ক করে জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘অস্তিত্বের লড়াইয়ে’ লিপ্ত রয়েছে এবং প্রয়োজনে আঞ্চলিক জ্বালানি রপ্তানি আরও সীমিত করা হতে পারে।
জ্বালানি বাজারের বিশ্লেষকদের মতে, সংকটের মূলে রয়েছে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনের নিরাপত্তা ঝুঁকি। বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু সমুদ্রপথ দিয়ে সম্পন্ন হয়। যেকোনো ধরনের সংঘাত এই রুটকে অকার্যকর করে দিতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দেবে। এছাড়া, লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে হুথি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে নতুন করে চাপ সৃষ্টির আশঙ্কাও সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে তুলেছে।
বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে নিসান সিকিউরিটিজ ইনভেস্টমেন্টের প্রধান কৌশলবিদ হিরোইউকি কিকুকাওয়া বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় তেলের চাহিদায় এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করছে। যদিও কূটনৈতিক পর্যায়ে মধ্যস্থতার চেষ্টা চলছে, তবুও সংঘাতের তীব্রতা বাড়লে ডব্লিউটিআই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৫ থেকে ৮৭ ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
এদিকে, গোল্ডম্যান স্যাক্সের বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি স্বাভাবিক হতে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিলে চলতি বছরের শেষ প্রান্তিকে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার অতিক্রম করতে পারে। তবে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমিত হলে এবং উৎপাদন সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি পেলে বছরের শেষ দিকে দাম ৬০ ডলারের ঘরে নেমে আসারও একটি তাত্ত্বিক সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে, মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ১০ জুলাই শেষ হওয়া সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অপরিশোধিত তেলের মজুত ১৭ লাখ ব্যারেল হ্রাস পেয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের প্রত্যাশা অনুযায়ী মজুতের এই হার ২৬ লাখ ব্যারেল না কমায়, অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটের ভীতিই তেলের দাম বৃদ্ধির পেছনে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতির ওপর বিশ্ব অর্থনীতি অনেকাংশেই নির্ভরশীল। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এবং তা হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথকে প্রভাবিত করলে জ্বালানি মূল্যের ঊর্ধ্বগতি সামাল দেওয়া বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। স্থিতিশীল সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এখন আন্তর্জাতিক মহলের জন্য অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।