আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক বিমান হামলায় ৩৫ জন নিহত ও তিন শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। গত কয়েক দিন ধরে চলা এই সামরিক অভিযানের জেরে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ও বিমান চলাচলের ওপর।
সর্বশেষ এই সামরিক অভিযানের লক্ষ্যবস্তু ছিল ইরানের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ শহর বন্দর আব্বাস এবং চাবাহারের সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, চলমান এই হামলায় নিহতের সংখ্যা ৩৫ জনে দাঁড়িয়েছে এবং আহত হয়েছেন অন্তত তিন শতাধিক নাগরিক। হামলার পর ইরানের অবকাঠামোগত ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা জানিয়েছে।
মার্কিন এই সামরিক অভিযানের প্রতিক্রিয়ায় ইরান এবং তার মিত্র গোষ্ঠীগুলো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে পাল্টা হামলা জোরদার করেছে। কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটি আকাশসীমায় ইরান থেকে প্রেরিত ২০টির বেশি ড্রোন এবং চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। এছাড়া ইরাকের ইরবিলে মার্কিন কনস্যুলেট ও একটি সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে, যা সংঘাতের বিস্তারকে নির্দেশ করে।
এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়ায় আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলো সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এয়ার কানাডা, এয়ার ফ্রান্স এবং এজিয়ান এয়ারলাইন্সের মতো বড় বিমান সংস্থাগুলো দুবাই, রিয়াদ, বৈরুত এবং তেল আবিবগামী ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য বাতিল করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা ব্যবহারে ঝুঁকি বাড়ায় সাধারণ যাত্রীদের পাশাপাশি বৈশ্বিক পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাতেও বিঘ্ন ঘটছে।
কূটনৈতিক ফ্রন্টে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য উত্তেজনাকে আরও ঘনীভূত করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, ইরান বর্তমানে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী। তবে তেহরানকে আলোচনার টেবিলে আসার আগে সংযত আচরণের শর্ত জুড়ে দিয়েছেন তিনি। বিপরীত অবস্থানে রয়েছে ইরান। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন যদি তাদের পূর্বের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়, তবে তেহরান কোনো ধরনের সমঝোতা চুক্তিতে আবদ্ধ থাকবে না। ফলে আপাতত সরাসরি আলোচনার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।
এই সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তেহরান যেন আন্তর্জাতিক উৎস থেকে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নতুন এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় ইরান, রাশিয়া ও নাইজেরিয়ার বেশ কয়েকজন ব্যক্তি এবং একাধিক সংস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পর্যবেক্ষক মহলের মতে, মার্কিন হামলা এবং ইরানের পাল্টা আক্রমণ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। উভয় পক্ষই যদি আলোচনার পরিবর্তে সামরিক শক্তির ব্যবহার অব্যাহত রাখে, তবে এই সংঘাত বৃহত্তর অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একদিকে ইরানের ওপর নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অন্যদিকে সামরিক স্থাপনায় হামলা তেহরানকে আরও কঠোর অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে, যা বর্তমান অস্থিরতাকে আরও প্রলম্বিত করবে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর মধ্যস্থতা না হলে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটের পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে।