আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পাকিস্তানের করাচির কুলসুম বাই ভ্যালিকা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও দুই শিশুর শরীরে হিউম্যান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস (এইচআইভি) শনাক্ত হয়েছে। এই নতুন আক্রান্তের মধ্য দিয়ে হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নেওয়া শিশুদের মধ্যে মোট এইচআইভি পজিটিভের সংখ্যা বেড়ে ৮০ জনে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসাসেবা নিতে এসে শিশুদের এভাবে মারাত্মক ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাটি পাকিস্তানজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
নতুন শনাক্ত হওয়া শিশুদের মধ্যে একজন করাচির মেট্রোভিল এলাকার তিন বছর বয়সী এক কন্যাসন্তান। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তীব্র বুকের সংক্রমণের (চেস্ট ইনফেকশন) চিকিৎসার জন্য তাকে সিন্ধ এমপ্লয়িজ সোশ্যাল সিকিউরিটি ইনস্টিটিউশন (এসইএসএসআই) পরিচালিত ওই ভ্যালিকা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে দীর্ঘ সময় চিকিৎসাধীন থাকার পরও শিশুটির শারীরিক অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি, বরং দিন দিন স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে থাকে। পরবর্তীতে চিকিৎসকদের পরামর্শে উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হলে শিশুটির শরীরে এইচআইভি সংক্রমণ ধরা পড়ে।
হাসপাতালটিতে একের পর এক শিশুর এইচআইভি আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি গত কিছুদিন ধরে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। এর আগে সিন্ধ প্রদেশের শ্রমমন্ত্রী সাঈদ ঘানি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছিলেন যে, কুলসুম বাই ভ্যালিকা হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া অন্তত ৭৮ জন শিশুর শরীরে এইচআইভি ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। নতুন করে আরও দুজনের নাম তালিকায় যুক্ত হওয়ায় এই সংখ্যা এখন ৮০-তে পৌঁছাল। প্রাদেশিক সরকারের পক্ষ থেকে এই ঘটনাটিকে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও দুঃখজনক’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং এর পেছনে জড়িত কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, এই ব্যাপক সংক্রমণের ঘটনাটি আদালতের দোরগোড়ায় পৌঁছেছে। চলতি মাসের শুরুতে সিন্ধ হাইকোর্ট বিষয়টিকে আমলে নিয়ে প্রাদেশিক সরকারকে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে হাসপাতালটিতে শিশুদের এইচআইভি সংক্রমণের কারণ ও গৃহীত পদক্ষেপের বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতে দায়ের করা একটি রিট আবেদনের শুনানিতে এই নির্দেশনা জারি করা হয়। উক্ত আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে যে, হাসপাতালের চরম অবহেলা এবং অব্যবস্থাপনার কারণে প্রকৃতপক্ষে প্রায় ২০০ শিশু এই মরণঘাতী ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে।
মামলার নথিসূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালে হাসপাতালটিতে রোগীদের চিকিৎসায় একই সিরিঞ্জ একাধিকবার ব্যবহার (দূষিত সিরিঞ্জের পুনর্ব্যবহার) করার ফলেই মূলত এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মৌলিক নিয়ম লঙ্ঘন করে এভাবে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রাদেশিক শ্রম মন্ত্রণালয়ও এই অভিযোগকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত সংকটের মুখে আক্রান্ত শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে সিন্ধ এমপ্লয়িজ সোশ্যাল সিকিউরিটি ইনস্টিটিউশন (এসইএসএসআই) একটি বিশেষ মানবিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সংস্থাটি আক্রান্ত শিশুদের কল্যাণে ২০০ কোটি পাকিস্তানি রুপি ব্যয়ে একটি ডেডিকেটেড বিশেষ তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই তহবিল থেকে শিশুদের আজীবন বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করা হবে বলে জানা গেছে। তবে এই উদ্যোগের পাশাপাশি পাকিস্তানের জনস্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও সুশাসনের অভাব নিয়ে জনমনে গভীর সংশয় দেখা দিয়েছে।