নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকার আমিনবাজার ও মাতুয়াইলে দুটি আধুনিক বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রবিবার (১২ জুলাই) সকাল সাড়ে ৯টায় সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিনি এই নির্দেশনা দেন। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে প্রকল্প দুটির কাজ সম্পন্ন এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন সরকারপ্রধান। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ত্বরান্বিত করতে স্থানীয় সরকার, বিদ্যুৎ ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে দ্রুত একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক আয়োজনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এবং বিদ্যুৎ সংকট দূরীকরণের লক্ষ্যে এই দুটি মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতাধীন আমিনবাজারে একটি পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। চীনের ঠিকাদারী ও বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সিএমইসি গ্রুপ এই প্রকল্পে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করছে। আমিনবাজারের এই প্ল্যান্টটিতে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার টন অপচনশীল ও গৃহস্থালি বর্জ্য ব্যবহার করা হবে, যা থেকে প্রতিদিন ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। প্রকল্পটির সার্বিক অগ্রগতি সন্তোষজনক উল্লেখ করে বৈঠকে জানানো হয়, সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২০২৮ সালের আগস্ট মাসের মধ্যে এই কেন্দ্রটি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ২৫ বছর এই কেন্দ্র থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ বজায় রাখা হবে।
অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে দক্ষিণ কোরিয়ার বিঅ্যান্ডএফ কোম্পানি একটি বৃহৎ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ হাতে নিয়েছে। মাতুয়াইলের এই আধুনিক প্রকল্পে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করা হবে। বিপুল পরিমাণ এই বর্জ্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে রিসাইক্লিং করে বছরে ১ লাখ ৫ হাজার টন মিথেন গ্যাস উৎপাদন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তীতে এই উৎপাদিত মিথেন গ্যাস ব্যবহার করে বছরে প্রায় ৮১ হাজার মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও উৎপাদন করা সম্ভব হবে, যা রাজধানীর একটি বড় অংশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত বর্ধনশীল ঢাকা মহানগরীর বর্জ্য অপসারণ ও পরিবেশ দূষণ রোধে এই প্রকল্প দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার দুটি প্রধান ল্যান্ডফিল আমিনবাজার ও মাতুয়াইলের বর্জ্য নিষ্কাশন নিয়ে পরিবেশবাদী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ছিল। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই আধুনিক প্রযুক্তি একদিকে যেমন উন্মুক্ত স্থানে আবর্জনা ফেলার ঝুঁকি কমাবে, অন্যদিকে মিথেন গ্যাসের মতো ক্ষতিকারক গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন হ্রাস করে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সাহায্য করবে। এছাড়া উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে তা দেশের চলমান জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে কার্যকর অবদান রাখবে।
বৈঠকে ঢাকা ও এর আশপাশের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার টেকসই মডেল গড়ে তোলার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী তার নির্দেশনায় উল্লেখ করেন, প্রকল্পের কাজ যেন কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে না থাকে, সেজন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে কাজের গুণগত মান বজায় রাখার তাগিদ দেন তিনি।
উক্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। এছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ স্থানীয় সরকার, বিদ্যুৎ ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।