রাজনীতি ডেস্ক
বাংলাদেশে আগামী ১০০ বছরেও আর কোনো গণঅভ্যুত্থান হবে না বলে মন্তব্য করেছেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। তিনি দাবি করেছেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে সাধারণ মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অংশ নিয়েছিল একটি বিশেষ আকাঙ্ক্ষা থেকে, কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি। রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের কারণে মানুষ এখন নতুন কোনো আন্দোলনে অংশ নেওয়ার আগে বারবার ভাববে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
গত শনিবার (১১ জুলাই) রাজধানী ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। ‘গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনীতি : সংকট, সম্ভাবনা ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক এই আলোচনা সভায় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলার অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন বক্তারা।
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা তাঁর বক্তব্যে সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, অনেকে সহজে আরেকটি গণঅভ্যুত্থানের কথা বললেও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। চব্বিশের আন্দোলনে এ দেশের সাধারণ মানুষ শেষবারের মতো নিজেদের জীবন বাজি রেখেছিল একটি বৈষম্যহীন সমাজ ও রাজনৈতিক কাঠামোর আশায়। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে তিনি অভিযোগ করেন, এই অভ্যুত্থানের সুফল কতিপয় মানুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশে একধরনের উগ্রবাদের উত্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে এবং সুযোগসন্ধানী কিছু গোষ্ঠী রাতারাতি বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক বনে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। এই ধরনের নেতিবাচক পরিবর্তনের কারণে সাধারণ মানুষ চরমভাবে হতাশ হয়েছে এবং ভবিষ্যতে তারা এ জাতীয় কোনো আন্দোলনে অংশ নেওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।
দেশের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট টেনে এই সংসদ সদস্য বলেন, সাধারণ মানুষ বারবার দেশের প্রয়োজনে রক্ত দিয়েছে, কিন্তু প্রতিবারই তারা রাজনৈতিক নেতৃত্বের দ্বারা প্রতারিত হয়েছে। তিনি উদাহরণ হিসেবে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণ-আন্দোলনের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, প্রতিটি ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষের ভাগ্যেন্নয়নের চেয়ে ক্ষমতার হাতবদলই মুখ্য হয়ে উঠেছে। বর্তমান পরিস্থিতিও তার ব্যতিক্রম নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। একই সাথে তিনি প্রশ্ন তোলেন, আন্দোলনের পরবর্তী ফলাফল যদি এমন উগ্রবাদ ও অর্থনৈতিক বৈষম্য হতো, তবে সাধারণ মানুষ আদৌ রাজপথে নামত কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
আলোচনা সভায় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অন্যান্য দলের শীর্ষ নেতারাও দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট নিয়ে কথা বলেন। বক্তারা দেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে সমুন্নত রাখতে এবং যেকোনো ধরনের চরমপন্থা ও উগ্রবাদ রুখতে সব রাজনৈতিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ ভূমিকার ওপর জোর দেন। তাঁরা বলেন, গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা ছিল রাষ্ট্র সংস্কার এবং একটি সাম্যবাদী সমাজ গঠন। কিন্তু যদি দ্রুত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা না যায়, তবে জনগণের ক্ষোভ আরও ঘনীভূত হতে পারে, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদি অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করবে।
জেএসডির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি তানিয়া রবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা সভায় অন্যান্যের মধ্যে আরও বক্তব্য দেন রাষ্ট্রসংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক হাসনাত কাইয়ুম, রাজনৈতিক বিশ্লেষক হেলালুজ্জামান আহমেদ, জেএসডির সহসভাপতি নুরুল আখতার এবং সিরাজ মিয়া সহ দলটির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ। বক্তারা দেশের বর্তমান ক্রান্তিকাল উত্তরণে একটি জাতীয় সংলাপ এবং দ্রুত রাজনৈতিক সংস্কার দৃশ্যমান করার তাগিদ দেন।