বিশেষ প্রতিবেদক
দেশের সমৃদ্ধি ও জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে যাদের বিতর্কিত ভূমিকা ছিল, তাদের অকপটে সেই দায় স্বীকার করে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আহমদ আযম খান। তিনি উল্লেখ করেছেন, স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষের বিভাজন ভুলে দেশ গড়ার স্বার্থে সবাইকে মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনায় ফিরে আসতে হবে।
শনিবার রাজধানীর মহাখালীতে ‘রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’ (রাওয়া) মিলনায়তনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘দি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়’ শীর্ষক এই সভার আয়োজন করে রাওয়া কর্তৃপক্ষ।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেন, “আমরা একটি ঐক্যবদ্ধ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই। যারা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে তাদের এগিয়ে আসতে হবে। অতীত ভূমিকার জন্য অকপটে ক্ষমা না চাইলে, সাধারণ জনগণ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে তা স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়া কঠিন। একটি গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র গঠনে সবাইকে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে ধারণ করতে হবে।”
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করে মন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল হবিগঞ্জের তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ব্যবস্থাপকের বাংলোতে এক গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। জেনারেল এম এ জি ওসমানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান দুটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করেন। এর প্রথমটি ছিল চলমান সশস্ত্র সংগ্রামের নাম হবে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং দ্বিতীয়টি ছিল এই যুদ্ধের সর্বাধিনায়কত্ব প্রদান করা হবে জেনারেল ওসমানীকে। মন্ত্রী জানান, ইতিহাসের এই অনন্য স্মারকটি সংরক্ষণে সরকার প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করেছে এবং সেখানে একটি স্থায়ী নামফলক স্থাপনের কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষায় নিয়োজিত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের অবদানের কথা উল্লেখ করে আহমদ আযম খান বলেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের যেভাবে সম্মানিত করে, ঠিক তেমনি পার্বত্য অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জীবন উৎসর্গকারী ও কর্মরত সেনা সদস্যদের সম্মান জানানোর বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সম্মাননাই এখানে মুখ্য বিষয়।
সভায় সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর পেশাদারিত্বের প্রশংসা করে মন্ত্রী বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে আরও শক্তিশালী ও আধুনিকায়ন করার লক্ষ্যে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। জাতীয় ঐক্য বজায় রেখে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করাই বর্তমান প্রশাসনের মূল লক্ষ্য।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরোচিত ও নৃশংস আক্রমণের মুখে যখন বাঙালি জাতি দিশেহারা হয়ে পড়েছিল, ঠিক তখনই ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সাহসের সঙ্গে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই চরম সংকটময় মুহূর্তে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা অবদমিত জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে চূড়ান্তভাবে উদ্দীপ্ত ও অনুপ্রাণিত করেছিল। তিনি ঐতিহাসিক এই সত্যকে সমুন্নত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
রাওয়া ক্লাবের চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আব্দুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবসরপ্রাপ্ত পদস্থ কর্মকর্তা, সামরিক ব্যক্তিবর্গ এবং বিশিষ্ট নাগরিকেরা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এর ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।