বিশেষ প্রতিবেদক
জাতিসংঘ সদর দফতরে অনুষ্ঠিত টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক ফোরামে (এইচএলপিএফ) জলবায়ু সহনশীলতা অর্জন, পানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি এবং উদ্ভাবনভিত্তিক শিল্পায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে বাংলাদেশ। স্থানীয় সময় ১০ জুলাই নিউইয়র্কে আয়োজিত এই বৈশ্বিক ফোরামে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে গৃহীত বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কৌশলগত পদক্ষেপের কথা তুলে ধরা হয়।
ফোরামের নির্ধারিত সেশনে বক্তব্য প্রদানকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. এস এম আবদুল আউয়াল জলবায়ু অভিযোজন ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অগ্রাধিকার ও অর্জিত সাফল্যসমূহ বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, দেশের সেচ ব্যবস্থা জোরদারকরণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুজ্জীবিতকরণ এবং গ্রামীণ ও শহুরে অঞ্চলে শতভাগ জনগণের জন্য নিরাপদ পানীয় জল নিশ্চিত করতে সরকার একটি মেগা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এই পরিকল্পনার আওতায় আগামী পাঁচ বছরে দেশজুড়ে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন করা হবে। এর ফলে দেশের সামগ্রিক কৃষি ও পরিবেশগত সুরক্ষায় দৃশ্যমান অগ্রগতি সাধিত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। একইসঙ্গে তিনি তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পসহ আন্তঃসীমান্ত নদী ও পানি ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অপরিহার্যতার বিষয়টিও বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেন।
এসডিজি-৯ (শিল্প, উদ্ভাবন ও অবকাঠামো) বিষয়ক পৃথক এক সেশনে ড. আউয়াল উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে চূড়ান্তভাবে উত্তরণের প্রাক্কালে অবস্থান করছে। এই উত্তরণকালীন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও পরবর্তী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে বাংলাদেশের বর্তমান উন্নয়ন কৌশলের মূলভিত্তি হিসেবে সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, টেকসই শিল্পায়ন এবং দেশীয় উদ্ভাবনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে সরকার দক্ষতা ও জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা- প্রশিক্ষণ (টিভিইটি), বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর আধুনিকায়নে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করেছে। একইসঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে তরুণ উদ্যোক্তা উন্নয়নে বহুমুখী সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে তিনি বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় খাতসমূহ, বিশেষ করে আধুনিক কৃষি, জৈব-প্রযুক্তি, ওষুধশিল্প, পরিবেশবান্ধব চামড়াশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি এবং সৃজনশীল শিল্পখাতে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) বৃদ্ধির জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান।
দেশীয় বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন সম্পর্কে তিনি বিশ্বনেতাদের অবহিত করেন যে, সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে একটি স্থিতিশীল, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশ সুসংহত হয়েছে। আইনি ও প্রশাসনিক সংস্কারের ফলে বাংলাদেশ এখন বিদেশি বিনিয়োগের জন্য অন্যতম প্রধান আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে, যা বহুজাতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার জন্য অত্যন্ত অনুকূল। এসব সমন্বিত উদ্যোগ দেশের টেকসই উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে বেগবান করবে, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং একটি সহনশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।