জাতীয় সংসদ ডেস্ক
১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভাঙার কোনো ইচ্ছা বা বিচ্ছিন্নতাবাদী হওয়ার বাসনা শেখ মুজিবুর রহমানের ছিল না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি উল্লেখ করেন, ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত আক্রমণের আগে তাজউদ্দীন আহমদের অনুরোধ সত্ত্বেও শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। শনিবার (১১ জুলাই) ‘রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (রাওয়া)’ আয়োজিত ‘দি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে ইতিহাস ঐতিহ্য এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ করতে যাচ্ছে এবং জনগণ স্বাধীনতা চায়—এমন বার্তা নিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে গিয়েছিলেন। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান তখন জানান যে তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদী হতে পারেন না এবং পাকিস্তান ভাঙতে তাঁর কোনো অবদান থাকুক তা তিনি চান না। এই কারণে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। স্পিকার বলেন, পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত আক্রমণের মুখে যখন বাঙালি জাতি দিশেহারা ও অবদমিত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, ঠিক তখনই ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সাহসের সাথে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই চরম সংকটময় মুহূর্তে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, যা বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে গভীরভাবে উদ্দীপ্ত ও অনুপ্রাণিত করেছিল। তিনি এটিকে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত সত্য ইতিহাস হিসেবে অভিহিত করেন।
জাতীয় সংসদের স্পিকার তাঁর বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের একক যুদ্ধ ছিল না, এটি ছিল এ দেশের আপামর জনসাধারণের সামগ্রিক যুদ্ধ। তিনি অভিযোগ করেন, স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসে একটি বিশেষ গোষ্ঠী সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ইতিহাস বিকৃত করেছে। তারা শুধু ৭ই মার্চের ভাষণের ওপর ভিত্তি করে স্বাধীনতার সামগ্রিক কৃতিত্ব এককভাবে নিতে চেয়েছিল, যা ছিল ইতিহাস ও জনগণের সাথে চরম অন্যায়। স্পিকার মন্তব্য করেন, রাজনীতিবিদরা সাধারণত অন্যের প্রকৃত কৃতিত্ব হাইজ্যাক করার চেষ্টা করেন এবং নিজের দলের নির্দিষ্ট নেতা ছাড়া অন্য কাউকে কোনো ঐতিহাসিক কৃতিত্ব দিতে চান না।
মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের গৌরবময় ভূমিকার কথা স্মরণ করে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রেজিমেন্টের মাত্র পাঁচটি ব্যাটালিয়ন কর্মরত ছিল। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত গণহত্যার প্রতিবাদে প্রতিটি ক্যান্টনমেন্টে বাঙালি সেনারা কোনো পূর্বপরিকল্পনা বা পারস্পরিক যোগাযোগ ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তারা জনগণকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য সর্বাত্মক আহ্বান জানায়। এই প্রাথমিক প্রতিরোধ যুদ্ধই পরবর্তী সময়ে ৯ মাসব্যাপী সংঘটিত রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল ভিত্তি ও কাঠামো স্থাপন করেছিল।
সেনাবাহিনীতে যোগদানের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে স্পিকার জানান, তিনি মূলত ফুটবল খেলার প্রতি গভীর টানেই সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের বিশেষ অনুপ্রেরণাতেই তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগদানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। তিনি স্বাধীনতার মহান ঘোষক এবং এ দেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন, যিনি তাঁকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগদানের জন্য উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করেছিলেন। এ ছাড়া তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রধান সংগঠক মেজর আব্দুল গনি এবং ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামের রেজিমেন্ট কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার মাহমুদুর রহমান মজুমদারের ঐতিহাসিক অবদানের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। পরিশেষে, তিনি সেনাবাহিনীর সৈনিকদের সাথে অফিসারদের সম্পর্কের চিরাচরিত ও পেশাদার বন্ধন পুনরায় শক্তিশালী করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহ্বান জানান।