আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈশ্বিক বাজারে ইরান সংঘাত-পূর্ব পরিস্থিতির কাছাকাছি দরপতনের পর মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড এবং মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) উভয়ের মূল্যেই ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। মূলত সংঘাতের তাৎক্ষণিক ঝুঁকি হ্রাস পাওয়ায় বিনিয়োগকারী ও বাজার বিশ্লেষকদের মনোযোগ এখন জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক সরবরাহ পরিস্থিতি এবং চাহিদার ভারসাম্যের দিকে স্থানান্তরিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারচিত্র অনুযায়ী, মঙ্গলবার গ্রিনিচ মান সময় রাত ১২টা ৪৬ মিনিট পর্যন্ত ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২৮ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৩৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৭২ দশমিক ২৯ ডলারে উন্নীত হয়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২৯ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ বেড়ে ৬৮ দশমিক ৮৪ ডলারে পৌঁছায়। এর আগের কার্যদিবসে অপরিশোধিত তেলের বাজারদর সংঘাত-পূর্ববর্তী সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি নেমে এসেছিল।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের তীব্রতা কমে আসায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে, যা তাৎক্ষণিক সংকটের আশঙ্কা দূর করেছে। তবে ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কেটে যায়নি। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের গতিপ্রকৃতির ওপর বর্তমান যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নির্ভর করছে। ফলে বাজার অংশীজন ও বড় বিনিয়োগকারীরা এখনো সতর্ক অবস্থান বজায় রাখছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক অবস্থান তেলের বাজারে নতুন মাত্রার জন্ম দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন হয় ইরানের সঙ্গে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাবে, অন্যথায় উদ্ভূত পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মহল এই বক্তব্যকে নতুন সামরিক বা অর্থনৈতিক পদক্ষেপের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। এই পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সম্ভাব্য আলোচনার অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। বিশেষ করে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালির নৌপরিবহন নিরাপত্তা এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি স্বাভাবিক রাখার বিষয়টি এখন বাজারের প্রধান নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাশাপাশি, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত জুন মাসে দৈনিক ৩৮ লাখ ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করেছে। এটি ২০২০ সালের এপ্রিল মাসের পর দেশটির সর্বোচ্চ দৈনিক উৎপাদন। এই উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে বাজারে সরবরাহ ঘাটতির আশঙ্কা অনেকটাই কেটে গেছে, যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে তেলের মূল্যের ওপর পড়তে পারে। সরবরাহ বৃদ্ধির এই ইতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে বাজারদরে প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে করছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, আগামী দিনগুলোতে তেলের দামের গতিপথ মূলত নির্ভর করবে এশিয়ার বৃহত্তম আমদানিকারক দেশ চীনের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও দেশটির অভ্যন্তরীণ জ্বালানি চাহিদার ওপর।
এদিকে, বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে জ্বালানি তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেক এবং রাশিয়াসহ তার সহযোগী দেশগুলোর জোট (ওপেক প্লাস) উৎপাদন বাড়ানোর ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। জোটটি আগামী আগস্ট মাস থেকে দৈনিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা আরও এক লাখ ৮৮ হাজার ব্যারেল বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এর আগে জুন ও জুলাই মাসেও জোটের পক্ষ থেকে একই হারে বাজারে সরবরাহ বাড়ানো হয়েছিল।
বাজারের এই প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতিতে বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব এশিয়ার ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে বড় ধরনের মূল্যছাড়ের ঘোষণা দিয়েছে। দেশটি আগামী আগস্ট মাসের জন্য তাদের প্রধান ‘আরব লাইট’ অপরিশোধিত তেলের সরকারি বিক্রয়মূল্য ওমান-দুবাই গড় মূল্যের তুলনায় ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ৫০ ডলার কম নির্ধারণ করেছে। আগের মাসের তুলনায় এই হ্রাসের পরিমাণ ১ দশমিক ১০ ডলার, যা গত দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে দেওয়া সবচেয়ে বড় মূল্যছাড়। ওপেক প্লাসের সরবরাহ বৃদ্ধি এবং সৌদি আরবের এই আগ্রাসী মূল্যছাড়ের নীতি আগামী দিনে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ভারসাম্য ও মূল্য নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।