বিশেষ প্রতিবেদক
রাজধানীর গুলশানে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বর্তমান বাসভবনকে ‘বিশেষ শ্রেণির’ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা (কেপিআই) হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার। এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রধানমন্ত্রীর গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাসভবন এবং এর আশপাশের সংলগ্ন এলাকা সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় চলে এসেছে। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের নিরাপত্তা জোরদার এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমের সুরক্ষায় সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, গত ৭ জুন কেপিআই-সংক্রান্ত কমিটির (কেপিআইডিসি) মাসিক সভায় গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাসভবনটিকে বিশেষ শ্রেণির কেপিআই হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার আনুষ্ঠানিক সুপারিশ করা হয়। পরবর্তীতে সরকারের নীতিগত অনুমোদনের ভিত্তিতে গত ১৫ জুন এ বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ৩ জুলাই (শুক্রবার) সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনটি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে।
বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গুলশানের এই বাসভবন থেকেই নিয়মিত সরকারি ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। যদিও রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনাকে সরকারি কাজের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত রাখা হয়েছে, তবে প্রধানমন্ত্রী সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন না। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দেশে প্রত্যাবর্তনের পর তিনি গুলশানের এই বাসভবনে অবস্থান শুরু করেন। পরবর্তীতে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করলেও তিনি এই বাসভবন থেকেই রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন অব্যাহত রেখেছেন।
ঐতিহাসিকভাবে এই বাসভবনের মালিকানা পর্যালোচনা করে জানা যায়, গত বছরের ৫ জুন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার হাতে বাড়িটির নামজারির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করে। ১৯৮১ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর গুলশানে প্রায় দেড় বিঘা জমির ওপর নির্মিত এই বাড়িটি বেগম খালেদা জিয়ার নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে নামজারি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর বাড়িটির প্রয়োজনীয় সংস্কার ও আধুনিকায়ন নিশ্চিত করা হয়।
বিশেষ শ্রেণির কেপিআই ঘোষণার পর এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সামগ্রিক নিরাপত্তা তদারকির জন্য স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) সমন্বয়ে একটি পৃথক উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা কমিটি গঠন করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বাসভবনটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্বে সার্বক্ষণিকভাবে বা ২৪ ঘণ্টা নিয়োজিত থাকবেন প্রেসিডেন্ট গার্ডস রেজিমেন্টের (পিজিআর) সদস্যরা। পিজিআর সদস্যদের পাশাপাশি এই নিরাপত্তা বলয়ে যুক্ত থাকবেন বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুলিশ বাহিনীর সদস্যরাও।
সরকারি নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুযায়ী, কেপিআই ঘোষিত এই স্থাপনার চারপাশের সীমানাপ্রাচীরের উচ্চতা ভূমি থেকে কমপক্ষে ১২ ফুট নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সাথে নিরাপত্তার খাতিরে সীমানাপ্রাচীরের ওপর আরও তিন ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট ‘ওয়াই’ আকৃতির কাঁটাতারের বেড়া স্থাপন নিশ্চিত করা হবে। সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি ও স্পর্শকাতরতা বিবেচনায় নিয়ে এই স্থাপনার আশপাশের বহুতল ভবন থেকে নজরদারি প্রতিরোধ, অননুমোদিত ছবি তোলা বন্ধ করা কিংবা যেকোনো ধরনের সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
নতুন এই নিরাপত্তা নির্দেশনার ফলে গুলশানের ওই বিশেষ স্থাপনার ১৫০ থেকে ৩০০ মিটারের মধ্যে নতুন কোনো উঁচু বা বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিশেষ ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সাথে, কেপিআই স্থাপনার ২৫ মিটারের মধ্যে নতুন কোনো ধরনের ভবন বা অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। স্থাপনার চারপাশের পাঁচ ফুট সীমানার মধ্যে অবস্থিত বিদ্যুৎ ও টেলিফোনের খুঁটি এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এমন সব গাছপালা দ্রুততম সময়ের মধ্যে অপসারণের জন্য সংশ্লিষ্ট সেবা সংস্থাসমূহকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও নীতিপ্রণেতারা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর পরিবারের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল নথিপত্র, গোপনীয় তথ্য এবং সামগ্রিক প্রশাসনিক কার্যক্রমের সর্বোচ্চ সুরক্ষার স্বার্থেই গুলশানের এই বাসভবনটিকে বিশেষ শ্রেণির কেপিআই হিসেবে ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে।