নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদ, লেখক এবং বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। গুণী এই গবেষকের মৃত্যুতে দেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করা এবং তার স্মৃতি ধরে রাখার জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
আজ সোমবার (৬ জুলাই) সকালে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে প্রয়াত অধ্যাপকের মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা জানান সংস্কৃতিমন্ত্রী। এর আগে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য প্রয়াত এই বুদ্ধিজীবীর মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রাঙ্গণ ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে যাওয়া হয়। জোহরের নামাজের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে শেষ জানাজা সম্পন্ন করে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক দেশকে ভালোবেসে আজীবন কাজ করে গেছেন। বিশেষ করে দেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতি খাতে তিনি যে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন, তা জাতি চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। তার অসমাপ্ত গবেষণা ও সৃষ্টিশীল কাজগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
এর আগে আজ সকাল ১০টায় বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মরদেহ তার দীর্ঘদিনের কর্মস্থল বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আনা হয়। সেখানে একাডেমির কর্মকর্তা, কর্মচারী, লেখক, সাহিত্যিক ও গবেষকেরা তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। একাডেমি প্রাঙ্গণেই তার দ্বিতীয় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর বেলা ১১টায় সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এবং বেলা ১২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে নেওয়া হয়। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা তাদের প্রিয় শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
উল্লেখ্য, গতকাল রবিবার (৫ জুলাই) দুপুরে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। তার মৃত্যুর সংবাদে দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক (সম্মান) এবং ১৯৬৬ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। শিক্ষা জীবন শেষ করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন এবং দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় অধ্যাপনা শেষে অবসরে যান। পরবর্তীকালে তিনি বাংলা একাডেমির সভাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দায়িত্ব পালন করছিলেন। বাংলাদেশে সর্ব স্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করার আন্দোলনে তিনি অন্যতম অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক শুধু একজন শিক্ষকই ছিলেন না, বরং একাধারে প্রাবন্ধিক, গবেষক ও চিন্তাবিদ হিসেবে দেশের সাহিত্য ক্ষেত্রে গভীর ছাপ রেখে গেছেন। তিনি ‘সুন্দরম’ ও ‘লোকায়ত’ নামে দুটি উচ্চমানের সাময়িকপত্র সম্পাদনা করেছেন। তার রচিত গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোর মধ্যে ‘একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন’, ‘সাহিত্য চিন্তা’, ‘রাজনীতি দর্শন’ ও ‘সংস্কৃতির সহজ কথা’ অন্যতম। তার লেখা অন্তত ২০টিরও বেশি মৌলিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া তিনি ‘ইতিহাসের আলোকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ ও ‘স্বদেশচিন্তা’র মতো একাধিক যুগান্তকারী গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন। বাংলা সাহিত্য ও গবেষণায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮১ সালে তিনি দেশের মর্যাদাপূর্ণ ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’-এ ভূষিত হন। তার এই প্রয়াণ দেশের সামগ্রিক জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে এক বড় শূন্যতার সৃষ্টি করল বলে মনে করছেন দেশের বিশিষ্টজনেরা।