ক্রীড়া প্রতিবেদক
ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে উদ্বোধনী ম্যাচেই এক অনন্য রেকর্ডের অনন্য উপাখ্যান রচনা করেছেন মেক্সিকোর ফরোয়ার্ড হুলিয়ান কিনিয়োনেস। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে আসরের প্রথম ম্যাচে মাঠে নেমে মেক্সিকোকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি এক জোড়া ঐতিহাসিক কীর্তি নিজের নামে করে নিয়েছেন এই ২৯ বছর বয়সী ফুটবলার। ম্যাচের মাত্র ৮ মিনিট ৩২ সেকেন্ডের মাথায় প্রতিপক্ষ গোলরক্ষককে পরাস্ত করে মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী আজতেকা স্টেডিয়ামের গ্যালারিকে উল্লাসে ভাসান তিনি। এই গোলের মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপের সুদীর্ঘ ইতিহাসে আসরের প্রথম গোলদাতা হিসেবে পেলে, পল ব্রাইটনার, ইয়ুর্গেন ক্লিন্সম্যান ও ফিলিপ লামের মতো বিশ্বখ্যাত কিংবদন্তিদের পাশে স্থান করে নিয়েছেন কিনিয়োনেস। একই সঙ্গে উত্তর, মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের (কনকাকাফ) প্রথম ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী গোল করার গৌরব অর্জন করেছেন তিনি।
হুলিয়ান কিনিয়োনেসের এই ঐতিহাসিক অর্জনের পেছনে রয়েছে একটি ভিন্ন প্রেক্ষাপট। জন্মসূত্রে মেক্সিকান না হওয়া সত্ত্বেও মেক্সিকোর জার্সিতে বিশ্বকাপ মাতানো এই ফরোয়ার্ডের আদি নিবাস কলম্বিয়ার মাগুই পায়ান অঞ্চলে। ফুটবল ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে কলম্বিয়ার অনূর্ধ্ব-২০ দলের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন তিনি। তবে দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটির মূল জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। ঘরোয়া ফুটবলে ধারাবাহিক নৈপুণ্য প্রদর্শনের পরও বছরের পর বছর উপেক্ষিত থাকায় একপর্যায়ে তিনি ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। ২০২৩ সালে কলম্বিয়ার জাতীয় দল থেকে ডাক আসার আগেই তিনি মেক্সিকোর নাগরিকত্ব গ্রহণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে একজন মেক্সিকান নারীকে বিয়ে করে আইনি প্রক্রিয়ায় জাতীয়তা পরিবর্তনের পর মেক্সিকোর জাতীয় দলের নিয়মিত সদস্য হয়ে ওঠেন এই ফরোয়ার্ড।
এই নাগরিকত্ব পরিবর্তনের ফলেই মূলত বিশ্বকাপ ফুটবল এক নজিরবিহীন রেকর্ডের সাক্ষী হয়েছে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম এমন একজন ফুটবলার আসরের উদ্বোধনী গোলটি করার কৃতিত্ব দেখালেন, যিনি নিজ দেশের মাটিতে জন্মগ্রহণ করেননি। এবারের বিশ্বমঞ্চে এক দেশে জন্মগ্রহণ করে অন্য দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছেন এমন ২৯২ জন ফুটবলার অংশ নিচ্ছেন, যাদের মধ্যে কিনিয়োনেস এই অনন্য কীর্তির মাধ্যমে নিজেকে এক ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক ফুটবলে খেলোয়াড়দের নাগরিকত্ব পরিবর্তন এবং অভিবাসী ফুটবলারদের প্রভাব দিন দিন কতটা বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিনিয়োনেসের এই রেকর্ডটি তারই একটি বড় দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে।
আন্তর্জাতিক ফুটবলের পাশাপাশি ক্লাব ফুটবলেও সাম্প্রতিক সময়ে অত্যন্ত উজ্জ্বল সময় পার করছেন হুলিয়ান কিনিয়োনেস। সৌদি প্রো লিগের ক্লাব আল কাদসিয়ার হয়ে গত মৌসুমে ৩১টি ম্যাচ খেলে ৩৩টি গোল করার এক অসামান্য কৃতিত্ব দেখিয়েছেন তিনি। সেই মৌসুমে সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৩৫টি ম্যাচে মাঠে নেমে মোট ৩৭টি গোল করেন এই মেক্সিকান স্ট্রাইকার। ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ফুটবলের এই দুর্দান্ত পরিসংখ্যানের মধ্য দিয়ে তিনি সৌদি লিগের অন্যতম শীর্ষ দল আল নাসরের পর্তুগিজ তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর গোলদাতাদের তালিকার রেকর্ডকেও পেছনে ফেলেছেন। যেখানে রোনালদো আল নাসরের হয়ে মোট ৩৭টি ম্যাচে ৩০টি গোল করতে সক্ষম হয়েছিলেন, সেখানে কিনিয়োনেস ৩৫ ম্যাচে ৩৭ গোল করে নিজের গোলক্ষুধা ও দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন।
যদিও মেক্সিকোর জাতীয় দলের জার্সিতে এখন পর্যন্ত হুলিয়ান কিনিয়োনেসের মোট গোলসংখ্যা খুব বেশি নয়, তবে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচেই এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ গোল তাঁর ক্যারিয়ারকে এক নতুন মাত্রা প্রদান করেছে। এই গোলের ওপর ভর করে মেক্সিকো টুর্নামেন্টে নিজেদের শুভসূচনা নিশ্চিত করতে সমর্থ হয়েছে। ঘরের মাঠে মেক্সিকানদের এই জয় এবং কিনিয়োনেসের বিশ্বরেকর্ড দলটিকে টুর্নামেন্টের পরবর্তী ম্যাচগুলোতে মানসিকভাবে অনেকটাই এগিয়ে রাখবে বলে মনে করছেন ফুটবল বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে এই ম্যাচটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে ফুটবলারদের মেধা, ধৈর্য এবং সুযোগের সঠিক ব্যবহারের একটি অনন্য উদাহরণ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।