আন্তর্জাতিক ডেস্ক
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচন আজ মঙ্গলবার (২ জুন)। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সাধারণ পরিষদকক্ষে স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় (বাংলাদেশ সময় রাত আটটা) এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ২০২৬-২০২৭ মেয়াদের এই গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের মুখোমুখি হচ্ছেন সাইপ্রাসের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ দূত রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিস। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্য নির্ধারিত এই সভাপতি পদে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করবেন জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, এবার দীর্ঘ চার দশক পর বাংলাদেশ পুনরায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এর আগে ১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। এরপর দীর্ঘ সময় ঢাকা এই পদের জন্য কোনো প্রার্থী দেয়নি। প্রায় চার বছর আগে এই ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছিল বাংলাদেশ।
দীর্ঘ এই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার শেষ মুহূর্তে এসে কিছু কৌশলগত ও রাজনৈতিক পরিবর্তন দেখা গেছে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনকে এই পদের জন্য মনোনীত করা হয়েছিল। তবে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও জাতীয় নির্বাচনের পর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার পূর্ববর্তী মনোনয়ন পরিবর্তন করে বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেয়।
কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে এই নির্বাচনকে ঘিরে বড় ধরনের সমীকরণ তৈরি হয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ফিলিস্তিন প্রার্থিতা ঘোষণা করায়। বাংলাদেশ ও ফিলিস্তিন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্র হওয়ায় একই পদের জন্য মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে ঢাকা দ্বিমুখী সংকটে পড়েছিল। ফিলিস্তিনের সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলে মুসলিম দেশগুলোর তথা ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) ভোট দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা দেখা দেয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কূটনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রেখে নিজস্ব প্রার্থিতা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখলেও তা প্রত্যাহার করেনি। পরবর্তীতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও আন্তর্জাতিক সমীকরণের ভিত্তিতে ফিলিস্তিন তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিলে বাংলাদেশের একক প্রতিযোগী হিসেবে শুধু সাইপ্রাসের নাম টিকে থাকে।
জাতিসংঘের কার্যবিধির ৩০ নম্বর ধারা অনুযায়ী, প্রতি বছর সাধারণ পরিষদের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্র গোপন ব্যালটের মাধ্যমে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে সভাপতি নির্বাচন করে থাকে। প্রতিটি রাষ্ট্রের জন্য একটি করে ভোট নির্ধারিত থাকে এবং সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে সভাপতি নির্বাচিত হন। এবারের নির্বাচনে ওআইসিভুক্ত রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজুড়ে জোরদার প্রচারণা চালানোর ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা ঢাকাকে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
নির্বাচনে বিজয়ের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও জাতিসংঘে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের দীর্ঘ কর্মজীবন ও অভিজ্ঞতা এ নির্বাচনে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশ অত্যন্ত সুসংহত ও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। এই নির্বাচনে জয়লাভ করতে পারলে তা বৈশ্বিক নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে বাংলাদেশের অবস্থানকে বহুদূর এগিয়ে নেবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ও মর্যাদাকে এক নতুন উচ্চতায় উন্নীত করবে।