আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাজ্যের উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টে সংঘটিত একটি ছুরিকাঘাতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে টানা দ্বিতীয় রাতেও ব্যাপক সহিংসতা ও অস্থিরতা বিরাজ করছে। দুই দিনব্যাপী চলা এই সহিংস দাঙ্গায় এ পর্যন্ত অন্তত ১২ জন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দাঙ্গাকারীদের লক্ষ্য করে জলকামান ও টিয়ারশেল ব্যবহার করেছে স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার বেলফাস্টের উত্তর-পশ্চিমে নিউ টাউনঅ্যাবির স্যান্ডিনোজ রাউন্ডঅ্যাবাউট এলাকায় প্রথম সহিংসতার সূত্রপাত হয়। সর্বশেষ বুধবার রাতেও কো অ্যান্ট্রিম ও অ্যান্ট্রিম রোড এলাকায় মুখোশধারী দাঙ্গাকারীরা পুলিশের ওপর চড়াও হয়। কালো পোশাক পরিহিত ও মুখ ঢাকা শতাধিক ব্যক্তি সড়কে জড়ো হয়ে ইট, পাথর ও পেট্রল বোমা নিক্ষেপ করে। দাঙ্গাকারীরা স্যান্ডিনোজ এলাকায় একটি সরকারি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে এবং আবাসিক এলাকার ময়লার বিনে আগুন ধরিয়ে রাস্তা অবরোধ করে। এছাড়া ডেরি শহরের আর্ডমোর রোড এলাকাতেও অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া গেছে। সহিংসতা আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় উত্তর আয়ারল্যান্ডে বেশ কিছু গণপরিবহন সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে এবং কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের আগেই ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।
উত্তর আয়ারল্যান্ডবিষয়ক সেক্রেটারি হিলারি বেন সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, প্রথম রাতের তুলনায় দ্বিতীয় রাতে সহিংসতার তীব্রতা কিছুটা কমলেও পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়। প্রায় দুই শতাধিক বিক্ষোভকারী একটি পেট্রল পাম্পের পাশে পরিত্যক্ত ভবনে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। বর্ণবাদী ও উগ্রপন্থী আচরণ দমনে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সহিংসতার নেপথ্যে থাকা মূল ঘটনার তদন্তে জানা গেছে, গত সোমবার স্টিফেন ওগিলভি নামের এক ব্যক্তির ওপর ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত চল্লিশোর্ধ্ব ওগিলভি বর্তমানে বেলফাস্টের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং এই হামলায় তিনি একটি চোখ হারিয়েছেন। এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ৩০ বছর বয়সী হাদি আলোদিদ নামের এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বুধবার তাকে আদালতে হাজির করে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এদিকে এই সহিংসতাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক গুজব ও ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। তবে আহত স্টিফেন ওগিলভির পরিবার পুলিশ মারফত দেওয়া এক বিবৃতিতে এই দাঙ্গার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হামলা নিয়ে ছড়ানো সব ধরনের ‘ভুল তথ্য’ ও বিভ্রান্তি ছড়ানো বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। ওগিলভির পরিবার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, তারা এই সহিংসতার সম্পূর্ণ বিরোধী এবং শান্তিপূর্ণ উপায়েই এর বিচার চান। একই সাথে দেশের স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনৈতিক খাতে অভিবাসীদের অবদানের কথা স্মরণ করে তারা যেকোনো বর্ণবাদী আচরণের বিপক্ষে নিজেদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট পরিভাষায় জানান, যারা সমাজে বিভাজন ও সহিংসতা উসকে দিচ্ছে এবং জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে সাধারণ মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করছে, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনসহ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।