রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারকে (৭) ধর্ষণের পর হত্যার মামলায় গ্রেপ্তার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে চার্জগঠন (অভিযোগ গঠন) শুনানি শুরু হয়েছে। আজ সোমবার (১ জুন) সকাল ১১টার পর আসামিদের ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে হাজির করা হয়। এর আগে, সকাল পৌনে ৮টায় কঠোর নিরাপত্তায় সোহেল রানাকে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার এবং স্বপ্না আক্তারকে কাশিমপুর কারাগার থেকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় আনা হয়।
আজ আদালতে হাজির করার সময় প্রধান আসামি সোহেল রানা উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, এই অপরাধের পেছনে ‘ডলার’ নামের এক ব্যক্তি জড়িত রয়েছেন, যিনি তাকে দুই লাখ টাকা দিয়েছিলেন। সোহেল রানা নিজেকে ধর্ষণের ঘটনায় সম্পৃক্ত দাবি করলেও হত্যার দায় ওই কথিত ব্যক্তির ওপর চাপানোর চেষ্টা করেন। একই সঙ্গে তিনি তার স্ত্রীর নির্দোষিতার দাবি করেন এবং তার ডিএনএ পরীক্ষার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তবে মামলার এজাহার ও তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আসামিরা ইতিমধ্যেই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
এর আগে, গত ২৪ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। তদন্তকারী কর্মকর্তার তথ্যমতে, সোহেল রানার বিরুদ্ধে সরাসরি ধর্ষণ ও হত্যার এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অপরাধে সহায়তার অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি পরিচালনার জন্য ১৮ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার দিনই মামলাটি দ্রুত বিচারের লক্ষ্যে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল-এ বদলি করা হয় এবং আদালত আজ ১ জুন চার্জ গঠনের শুনানির দিন ধার্য করেছিলেন। এর মাধ্যমে মামলার প্রাথমিক তদন্ত, ডিএনএ পরীক্ষা, অভিযোগপত্র দাখিল এবং আদালতে তা আমলে নেওয়ার প্রধান চারটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হলো।
আইনি প্রক্রিয়ার সার্বিক বিষয়ে মামলার রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আজিজুর রহমান দুলু জানান, মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম যেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেষ হয়, সে লক্ষ্যে রাষ্ট্রপক্ষ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দায়িত্ব পালন করবে। তবে বিচার প্রক্রিয়ার পরবর্তী নির্দেশনা ও সিদ্ধান্ত ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক নির্ধারিত হবে।
এদিকে মামলার রায় এবং তা কার্যকরের আইনি জটিলতা প্রসঙ্গে ঢাকার জেলা লিগ্যাল এইডের নিয়মিত আইনজীবী রায়হানা নাজনীন জুই জানান, মামলার বর্তমান অগ্রগতি বিশ্লেষণ করলে প্রতীয়মান হয় যে, নিম্ন আদালতে বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ হবে। তবে চূড়ান্ত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে রায় কার্যকর করার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত নিম্ন আদালতের রায়ের পর উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির কারণে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি বিলম্বিত হয়। এই জটিলতা নিরসনে কারা কর্তৃপক্ষ এবং উচ্চ আদালতের বিশেষ নজরদারি থাকলে মামলাটি দ্রুত চূড়ান্ত পরিণতি পাবে, অন্যথায় দীর্ঘসূত্রতার আশঙ্কা থেকে যায়।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা আক্তার ঘর থেকে বের হলে আসামি স্বপ্না আক্তার তাকে কৌশলে তাদের ফ্ল্যাটে নিয়ে যান। দীর্ঘ সময় শিশুটিকে খুঁজে না পেয়ে রামিসার পরিবার ও প্রতিবেশীরা ভবনের ওই ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। সেখানে শয়নকক্ষের মেঝে থেকে রামিসার মস্তকবিহীন দেহ এবং বাথরুমের বালতির ভেতর থেকে তার বিচ্ছিন্ন মাথা উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পরপরই জানালার গ্রিল কেটে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা পালিয়ে গেলেও পরবর্তী সময়ে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জ থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ঘটনার নৃশংসতার কারণে মামলাটি রাজধানীসহ দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।