বিশেষ প্রতিবেদক
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর করিডোরে নির্মিত বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের অবকাঠামোকে বিশেষায়িত বাস লেনের পরিবর্তে সব ধরনের যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার সুপারিশ করেছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় গঠিত দুটি বিশেষ কমিটি। একই সঙ্গে প্রকল্পের নকশাগত ত্রুটির কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি ‘রিভিউ কমিটি’ও সমজাতীয় প্রতিবেদন দাখিল করেছে। সুপারিশসমূহ বাস্তবায়িত হলে সোয়া ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই করিডোরটি বিআরটি ব্যবস্থার পরিবর্তে সাধারণ উন্নত দ্রুতগতির সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হবে এবং নির্মাণ ব্যয় তুলে আনতে যানবাহন থেকে টোল আদায় করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিমানবন্দর-গাজীপুর করিডোরে বিআরটি প্রকল্পের নকশাগত ত্রুটির জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করা এবং উদ্ভূত পরিস্থিতিতে করণীয় নির্ধারণে গত বছরের আগস্টে মন্ত্রণালয় দুটি কমিটি গঠন করে। পরবর্তী সময়ে এই কমিটি দুটির প্রতিবেদন পর্যালোচনার জন্য বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হকের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘রিভিউ কমিটি’ গঠন করা হয়। রিভিউ কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডোরের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল এলাকা বিআরটি ব্যবস্থার জন্য মোটেও উপযুক্ত নয়। অনেক স্থানে প্রয়োজনীয় সার্ভিস রোড ও ফুটপাত রাখা হয়নি। এছাড়া সড়কের মাঝখানে মাত্র দুটি লেন নির্ধারিত থাকায় সাধারণ যান চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে, যেখানে একটি কার্যকর বিআরটি ব্যবস্থার জন্য আরও প্রশস্ত সড়কের প্রয়োজন ছিল। এই অবস্থায় বর্তমান নকশা অনুযায়ী বিআরটি পুরোপুরি চালু করা হলে গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও উত্তরাঞ্চলমুখী লেনে তীব্র যানজট সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিবেদনে প্রকল্পটির নকশাগত ত্রুটি ও বিপুল অর্থ অপচয়ের জন্য এর সঙ্গে জড়িত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের সরাসরি দায়ী করে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রকল্পের মূল অবকাঠামো বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে সওজ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান জানান, দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সরকারের বিদ্যমান বিধিমালা ও নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রকল্পটির আন্তর্জাতিক ও দেশীয় পরামর্শক হিসেবে যুক্ত ছিল অস্ট্রেলিয়ার এসএমইসি ইন্টারন্যাশনাল ও ব্রিসবেন সিটি এন্টারপ্রাইজ, ফ্রান্সের সিস্ট্রা এসএ এবং বাংলাদেশের এসিই কনসালট্যান্স লিমিটেড। তাদের মূল দায়িত্ব ছিল প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, সমন্বয় ও নির্মাণ কার্যক্রমের তত্ত্বাবধান। অন্যদিকে করিডোর পরিচালনা ও ব্যবসায়িক মডেল তৈরির দায়িত্বে যৌথভাবে যুক্ত ছিল ভারতের সিইপিটি বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটের ব্যুরো অব রিসার্চ টেস্টিং অ্যান্ড কনসালটেশন। তবে অপারেশনাল মডেল বাস্তবায়নে গুরুতর সমস্যা দেখা দেয়ায় পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠান দুটি প্রকল্প থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়।
রিভিউ কমিটির সুপারিশে বলা হয়েছে, মেগা প্রকল্পটির বৈদেশিক ঋণ ও নির্মাণ ব্যয় আংশিক পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে বিআরটি লেন ব্যবহারের জন্য যানবাহন থেকে টোল আদায় করা যেতে পারে। এজন্য টঙ্গী ওভারপাস এলাকায় একটি কেন্দ্রীয় টোল প্লাজা স্থাপন এবং বিদ্যমান বিআরটি স্টেশনগুলোকে সংস্কার করে টোল বুথ হিসেবে ব্যবহার করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
ঢাকার গণপরিবহন সংকট ও যানজট নিরসনে মেট্রোরেলের মতো দ্রুত যাতায়াত সুবিধা নিশ্চিত করতে ২০১২ সালে তৎকালীন সরকার বিমানবন্দর-গাজীপুর বিআরটি প্রকল্প গ্রহণ করে। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই প্রকল্পের বর্তমানে প্রায় ৯৭ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে কারিগরি ও নকশাগত জটিলতার কারণে এখন এটি বন্ধ করে সাধারণ সড়ক হিসেবে ব্যবহারের আইনি ও নীতিগত প্রক্রিয়া চলছে।
সার্বিক বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের দায়িত্বে থাকা প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ জানান, বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে মন্ত্রণালয় নিবিড়ভাবে কাজ করছে। বিশেষজ্ঞদের প্রতিবেদন ও সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত নীতিগত সিদ্ধান্তের জন্য বিষয়টি খুব দ্রুত মন্ত্রিপরিষদের সভায় উপস্থাপন করা হবে। মন্ত্রিপরিষদের নির্দেশনা অনুযায়ী এই করিডোরের পরবর্তী ব্যবহারিক রূপরেখা চূড়ান্ত করা হবে।
সৌজন্যে বণিক বার্তা