আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় (ইউএসএফ) অধ্যয়নরত দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নতুন চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। প্রায় ১০ দিন নিখোঁজ থাকার পর গত ২৪ এপ্রিল ফ্লোরিডার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ থেকে লিমনের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এই ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে লিমনের রুমমেট ও মার্কিন নাগরিক হিশাম আবুঘরবেহকে (২৬) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, লিমনকে হত্যার পর নাহিদা সুলতানা বৃষ্টিকেও হত্যা করে তার মরদেহ গুম করেছেন অভিযুক্ত হিশাম।
আদালতে জমা দেওয়া প্রসিকিউশনের নথিপত্র এবং পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, জামিল আহমেদ লিমনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে অত্যন্ত নৃশংসভাবে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত মরদেহে একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা এই হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা নির্দেশ করে। হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ অফিস জানিয়েছে, ২৬ বছর বয়সী হিশাম আবুঘরবেহর বিরুদ্ধে দুটি প্রথম-ডিগ্রি পরিকল্পিত হত্যার (First-degree premeditated murder) অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে মরদেহ গুম করা, তথ্য-প্রমাণ নষ্ট করা, অবৈধভাবে আটকে রাখা এবং প্রাণঘাতী হামলার মতো গুরুতর একাধিক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, ঘটনার পর থেকে লিমনের সহপাঠী ও অপর বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি নিখোঁজ রয়েছেন। তবে পুলিশি তল্লাশিতে লিমন ও অভিযুক্ত হিশামের অ্যাপার্টমেন্টে প্রচুর পরিমাণে রক্তের দাগ পাওয়া গেছে। ফরেনসিক পরীক্ষায় সেই রক্তের নমুনার সঙ্গে নিখোঁজ নাহিদা বৃষ্টির ডিএনএ মিলেছে বলে তার পরিবারকে জানানো হয়েছে। এই আলামতের ভিত্তিতে গোয়েন্দাদের ধারণা, বৃষ্টিকেও একই সময়ে অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে হত্যা করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে তার মরদেহ অন্য কোথাও সরিয়ে ফেলা হয়েছে। নিখোঁজ বৃষ্টির মরদেহ উদ্ধারে বর্তমানে অভিযান অব্যাহত রেখেছে স্থানীয় পুলিশ।
ইতোমধ্যে অভিযুক্ত হিশাম আবুঘরবেহকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। প্রসিকিউটররা আদালতে যুক্তি দেখিয়েছেন যে, অপরাধের ধরন অত্যন্ত সহিংস এবং জননিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। অপরাধের প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে আদালত তাকে পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত কারাগারে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। হিলসবরো কাউন্টি পাবলিক ডিফেন্ডার অফিস থেকে অভিযুক্তের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটি একটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় অভিযুক্তের কোনো প্রকার জামিন পাওয়ার সুযোগ নেই।
উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া দুই মেধাবী শিক্ষার্থীর এমন মর্মান্তিক পরিণতিতে ফ্লোরিডার বাংলাদেশি কমিউনিটি এবং ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। পুলিশ বলছে, ঘটনার মোটিভ বা নেপথ্যের কারণ উদ্ঘাটনে অভিযুক্তকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একই সাথে নিখোঁজ নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির দেহের সন্ধানে হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ সংলগ্ন এলাকা ও পার্শ্ববর্তী জলাশয়গুলোতে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে।
মার্কিন আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী, প্রথম-ডিগ্রি হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত হিশাম আবুঘরবেহর সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে ফরেনসিক রিপোর্টের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল এবং পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে মামলার অভিযোগপত্র চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। দূতাবাসের পক্ষ থেকেও বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে এবং দোষী ব্যক্তি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি হবে।