আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং এই জলপথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে টোল আদায়ের বিষয়ে অনড় অবস্থান নিয়েছে ইরান। প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে হলেও এই জলপথের ওপর সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে তেহরান দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে দেশটির শীর্ষস্থানীয় নীতি-নির্ধারকেরা জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিতীয় দফার শান্তি বৈঠকের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হওয়ার আগেই এই বিষয়ে ওয়াশিংটনকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফ এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) শর্তসমূহ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন না করে, তবে তেহরান যেকোনো ধরনের সংঘাত বা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। ওয়াশিংটন নিজেদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হলে স্থায়ী শান্তি চুক্তি নিয়ে চলমান আলোচনা আর সামনে এগোবে না বলেও তিনি স্পষ্ট বার্তা দেন।
উল্লেখ্য, প্রায় তিন মাসব্যাপী তীব্র সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনার অবসান ঘটাতে চলতি মাসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল রপ্তানির ওপর আরোপিত কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করে নেয়। স্পিকার কলিবফ জানান, হরমুজ প্রণালির ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ প্রত্যাহারের পর থেকে ইরান এ পর্যন্ত চার কোটি ব্যারেলেরও বেশি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্যমতে, বিদ্যমান সমঝোতা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ইরান আগামী ৬০ দিন কোনো ধরনের শুল্ক বা বাধা ছাড়াই আন্তর্জাতিক পণ্যবাহী ও বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করতে দিতে সম্মত হয়েছে। তবে তেহরানের দাবি, ওমান ও ইরানের যৌথ কর্তৃত্বাধীন এই সংকীর্ণ জলপথের কোন রুট ব্যবহার করে কোন কোন জাহাজ চলাচল করবে, তা নির্ধারণের চূড়ান্ত আইনি ও কৌশলগত ক্ষমতা একমাত্র ইরানের হাতেই থাকবে। এটি ইরানের আঞ্চলিক জলসীমার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এর ওপর নিজেদের অধিকার কোনো অবস্থাতেই হাতছাড়া করা হবে না বলে তেহরান পুনর্ব্যক্ত করেছে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তীকালীন এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর হরমুজ প্রণালির ওপর স্থায়ী ও আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করাই এখন ইরানের মূল লক্ষ্য। ইরানি আলোচকেরা ওয়াশিংটনের সাথে চলমান শান্তি সংলাপে এই বিষয়টি এজেন্ডার শীর্ষে রেখেছেন। প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও টোল আদায়ের বিষয়ে কোনো টেকসই সমাধান বা রফা না হওয়া পর্যন্ত ইরান অন্য কোনো বিরোধপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্থায়ী চুক্তির বিষয়ে কোনো অগ্রগতি না হয় এবং অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির মেয়াদ আর বৃদ্ধি করা না হয়, তবে আগামী আগস্টের মাঝামাঝি সময় থেকে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী সকল বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে টোল আদায় শুরু করবে তেহরান। যদিও এই টোলের পরিমাণ কত হবে কিংবা তা কী পদ্ধতিতে আদায় করা হবে, সে বিষয়ে দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বা তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।
বিশ্বের মোট খনিজ তেল পরিবহনের একটি বড় অংশ এই হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় ইরানের এই অনড় অবস্থান বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সংঘাত শুরুর প্রাথমিক পর্যায়ে ইরান এই প্রণালিটি অবরুদ্ধ করে দিয়েছিল। তৎকালীন সময়ে পারস্য উপসাগর ত্যাগ করার সময় বেশ কিছু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে নৌ-চলাচল ফি এবং অন্যান্য শুল্ক আদায় করা হয়েছিল বলে ইরানের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যকার দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক টানাপোড়েন কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।