আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমঝোতা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম পুনরায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ায় সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় বাজারের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
গত রোববার (২৬ এপ্রিল) বৈশ্বিক তেলের মূল্য নির্ধারণের প্রধান মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম ২ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১২টায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ১০৭.৩৫ ডলারে উন্নীত হয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমান এই বাজারমূল্য রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগের সময়কালের তুলনায় প্রায় ৪৭ শতাংশ বেশি। বিশ্বজুড়ে সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের ফলে তেলের বাজারে এই অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের সরাসরি প্রভাব পড়ছে তেলের মূল্যের ওপর। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতি বিশ্ববাজারে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। উল্লেখ্য যে, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ এই সংকীর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই পথে কোনো ধরণের প্রতিবন্ধকতা বা নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হলে তা সরাসরি বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনকে ব্যাহত করে, যা দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সংকট ও মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের পারমাণবিক চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করার প্রক্রিয়াটি বর্তমানে এক প্রকার স্থবির হয়ে পড়েছে। কূটনৈতিক পর্যায়ে এই সমঝোতা সফল হলে ইরানের তেল বিশ্ববাজারে আসার পথ সুগম হতো, যা তেলের ক্রমবর্ধমান দাম নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসায় বিনিয়োগকারীরা সরবরাহ ঘাটতির আশঙ্কা করছেন, যার প্রতিফলন ঘটছে তেলের বাড়তি দামে।
জ্বালানি তেলের বাজারে এমন অস্থিরতা বিরাজ করলেও এশিয়ার প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে এর প্রাথমিক প্রভাব ভিন্নভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে। সোমবার লেনদেনের শুরুতে এশিয়ার প্রধান সূচকগুলো ইতিবাচক অবস্থানে থাকতে দেখা গেছে। জাপানের প্রধান শেয়ার বাজার সূচক ‘নিক্কেই ২২৫’ প্রায় ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার ‘কসপি’ সূচক ১.৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে দেখা গেছে। জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য সাধারণত উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তবে এশিয়ার বাজারে এই প্রবৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের ভিন্ন কোনো অর্থনৈতিক প্রত্যাশার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তেলের এই উচ্চমূল্য অব্যাহত থাকলে উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় দেশেই পরিবহণ ও উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ওপেকের (OPEC) দেশগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধির কোনো সিদ্ধান্ত আসে কি না, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে বিশ্ববাজার। তবে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রশমিত না হওয়া পর্যন্ত জ্বালানি তেলের বাজার স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বাজার সংশ্লিষ্টরা।