আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা প্রশমন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে চলমান সংঘাতের স্থায়ী অবসানে তিন পর্যায়ের একটি নতুন শান্তি প্রস্তাব পেশ করেছে ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ওয়াশিংটন যদি পুনরায় দ্বিপাক্ষিক সংলাপে বসতে আগ্রহী হয়, তবে এই নতুন প্রস্তাবনার ভিত্তিতেই কেবল আলোচনা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান যুদ্ধের মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্র পাকিস্তানের মাধ্যমে এই প্রস্তাবটি যুক্তরাষ্ট্রের নিকট আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠানো হয়েছে।
ইরানের প্রস্তাবিত এই শান্তি পরিকল্পনার প্রথম পর্যায়ে শর্ত দেওয়া হয়েছে যে, বর্তমান যুদ্ধ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। একইসঙ্গে ইরান এবং লেবাননের সার্বভৌমত্বের ওপর ভবিষ্যতে আর কোনো ধরনের আগ্রাসী সামরিক হামলা চালানো হবে না— যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে এই মর্মে সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। তেহরানের দাবি, অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফেরাতে হলে আগে সামরিক উসকানি ও আক্রমণাত্মক তৎপরতা বন্ধ করা অপরিহার্য।
দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রস্তাবে ইরান কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ প্রসঙ্গটি অন্তর্ভুক্ত করেছে। প্রথম পর্যায়ের শর্তসমূহ যদি ওয়াশিংটন ও তেল আবিব মেনে নেয়, তবে দ্বিতীয় ধাপে হরমুজ প্রণালির প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং এর পরিচালনা সংক্রান্ত কাঠামো নিয়ে আলোচনা শুরু করতে আগ্রহী ইরান। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান এই রুটটির নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের যে বিরোধ রয়েছে, তার একটি স্থায়ী প্রশাসনিক সমাধান এই পর্যায়ে খোঁজা হবে।
শান্তি প্রস্তাবের চূড়ান্ত বা তৃতীয় পর্যায়ে তেহরান তাদের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার দ্বার উন্মোচন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যদি প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের শর্তাবলি সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ কর্তৃক সফলভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়, তবেই কেবল পরমাণু প্রকল্প নিয়ে দরকষাকষি শুরু হবে। উল্লেখ্য, পশ্চিমাবিশ্ব দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে, যা এই প্রস্তাবের মাধ্যমে নতুন মোড় নিতে পারে।
ইরানের এই নতুন কূটনৈতিক পদক্ষেপের বিষয়ে মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান জানতে হোয়াইট হাউসের সাথে যোগাযোগ করা হলে মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়ালেস বিষয়টিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল বলে অভিহিত করেন। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র এই মুহূর্তে গণমাধ্যমে এ নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করবে না। তবে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ওয়াশিংটন কেবল এমন একটি চুক্তিতেই স্বাক্ষর করবে যা মার্কিন জনগণের জাতীয় নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেয় এবং ইরানকে কোনোভাবেই পরমাণু অস্ত্রধারী রাষ্ট্রে পরিণত হতে দেবে না।
এর আগে গত ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের ইসলামাবাদে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে পরমাণু প্রকল্প নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। দীর্ঘ ২১ ঘণ্টা ধরে নিবিড় আলোচনার পরও সেই বৈঠক কোনো নির্দিষ্ট চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। প্রথম দফার সেই সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার পর পাকিস্তানসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শক্তি উভয় পক্ষকে পুনরায় আলোচনার টেবিলে বসার আহ্বান জানায়। তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি সম্প্রতি একাধিকবার পাকিস্তান সফর করলেও সরাসরি মার্কিন প্রতিনিধিদের সাথে দ্বিতীয়বার বৈঠকে বসার প্রস্তাব শুরুতে নাকচ করে দিয়েছিলেন।
ইরানের এই অনড় অবস্থানের প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনিও তার প্রতিনিধি দলকে দীর্ঘ বিমান যাত্রায় বারবার পাঠাতে আগ্রহী নন। ট্রাম্পের মতে, এখন থেকে সরাসরি আলোচনার পরিবর্তে ফোনকল বা বিকল্প মাধ্যমে কূটনৈতিক যোগাযোগ রক্ষা করা হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন কড়া বার্তার পরই তেহরান তাদের তিন স্তরের এই নতুন প্রস্তাবনা পেশ করল।
কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি সম্প্রতি ওমান ও পাকিস্তান সফর শেষ করে বর্তমানে রাশিয়ায় অবস্থান করছেন। আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সাথে এই আলাপ-আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন কোনো সমীকরণ তৈরি করে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই প্রস্তাব গৃহীত হলে তা একদিকে যেমন যুদ্ধবিরতির পথ প্রশস্ত করবে, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও পরমাণু ইস্যুতে দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের সম্ভাবনা তৈরি করবে। তবে ইসরায়েলের সম্মতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর শর্তাবলি এই শান্তি প্রস্তাব বাস্তবায়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।