নিজস্ব প্রতিবেদক
যশোরের শার্শা উপজেলায় ঐতিহাসিকভাবে পরিচিত ‘উলশী খাল’ বা ‘জিয়া খাল’ পুনঃখনন প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার (২৭ এপ্রিল) দুপুর ১২টার দিকে তিনি শার্শা উপজেলার উলশী এলাকায় এই খনন কাজের সূচনা করেন। দেশের কৃষিজ উৎপাদন বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গৃহীত এই উদ্যোগটি বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনা ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নামফলক উন্মোচন করেন এবং প্রতীকীভাবে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে পুনঃখনন কাজের সূচনা করেন। উল্লেখ্য, ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে শার্শা উপজেলার উলশী থেকে যদুনাথপুর পর্যন্ত প্রায় ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালটি খনন করেছিলেন। দীর্ঘ পাঁচ দশক পর পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া এই গুরুত্বপূর্ণ খালটি আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনার আওতায় পুনরায় খনন করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। এছাড়া পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে।
যশোর অঞ্চলের কৃষি ও পরিবেশগত উন্নয়নে এই খালের গুরুত্ব অপরিসীম। নব্বইয়ের দশকের পর থেকে যথাযথ সংস্কারের অভাবে খালটি নাব্যতা হারায়, যার ফলে স্থানীয় বিস্তীর্ণ কৃষি জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতো এবং বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হতো। পুনঃখনন কাজ সমাপ্ত হলে এই খালের মাধ্যমে হাজার হাজার একর ফসলি জমি সেচ সুবিধার আওতায় আসবে। এছাড়া মাছ চাষ এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এই খালটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পের কারিগরি দিক পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আধুনিক প্রকৌশল বিদ্যা ব্যবহার করে খালের গভীরতা ও প্রস্থ এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে শুষ্ক মৌসুমেও পানি ধরে রাখা সম্ভব হয়। এতে করে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরের ওপর চাপ কমবে এবং কৃষকরা স্বল্প খরচে সেচ কাজ পরিচালনা করতে পারবেন। একইসাথে এই খনন কার্যক্রম স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
উল্লেখ্য যে, পাঁচ দশক আগে শুরু হওয়া ‘উলশী প্রকল্প’ বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়নে একটি মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃত। তৎকালীন সময়ে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণের যে ধারা শুরু হয়েছিল, তার অন্যতম উদাহরণ ছিল এই উলশী খাল। বর্তমান সরকার সেই ধারাকে আধুনিক প্রযুক্তির সাথে সমন্বয় করে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের প্রকল্পের গুণগত মান বজায় রেখে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করার প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দেশের অভ্যন্তরীণ জলাশয় ও খালগুলো সংস্কার করা অপরিহার্য। উলশী খালের পুনঃখনন কেবল একটি ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, বরং এটি বৃহত্তর খুলনা ও যশোর অঞ্চলের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটাবে। সরকারের এই পদক্ষেপে স্থানীয় কৃষক সমাজের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া লক্ষ্য করা গেছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই খালের পুরো দৈর্ঘ্য খনন সম্পন্ন করে পানি প্রবাহ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড।