নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে জনজীবনে স্বস্তি ফেরাতে জাতীয় গ্রিডে নতুন করে ১ হাজার ৯৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। এপ্রিল মাসের শেষ নাগাদ এই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে বিদ্যমান বিদ্যুৎ রেশনিং বা লোডশেডিং পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, চলতি মাসের মধ্যেই ভারতের আদানি পাওয়ার, চট্টগ্রামের এসএস পাওয়ার এবং পটুয়াখালীর পায়রাভিত্তিক আরএনপিএল (রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড ও নরিনকো ইন্টারন্যাশনালের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত) বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে এই বাড়তি বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ইউনিটগুলো পুনরায় সচল হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিশেষ করে কারিগরি ও রক্ষণাবেক্ষণ জনিত কারণে বন্ধ থাকা ইউনিটগুলো উৎপাদনে ফিরলে জাতীয় গ্রিডে সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ সরবরাহকারী বিদেশি প্রতিষ্ঠান আদানি পাওয়ার গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তাদের দুটি ইউনিটের একটি বন্ধ রেখেছিল। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, ২৬ এপ্রিল থেকে জাতীয় গ্রিডে আদানি পাওয়ার থেকে অতিরিক্ত ৭৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ হতে শুরু করবে। অন্যদিকে, কয়লা সংকটের কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ থাকা কেন্দ্রগুলো পুনরায় সচল করার লক্ষ্যে কয়লাবাহী জাহাজ পায়রা বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এর ফলে চট্টগ্রামের এসএস পাওয়ার ও পটুয়াখালীর আরএনপিএল থেকে আগামী ২৮ এপ্রিলের মধ্যে যথাক্রমে ৬০০ মেগাওয়াট করে মোট ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বর্তমানে দেশে তীব্র তাপপ্রবাহ বিরাজ করছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, রাজশাহী, ঢাকা ও যশোর-খুলনা অঞ্চলে তাপমাত্রা ৩৭ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। অসহনীয় এই গরমে বিদ্যুতের চাহিদা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। বিপিডিবির পরিসংখ্যান বলছে, গত শুক্রবার সন্ধ্যায় সর্বোচ্চ উৎপাদন ছিল ১৪ হাজার ১৯৬ মেগাওয়াট, যেখানে শনিবার সন্ধ্যায় বিদ্যুতের চাহিদা দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ৯০০ মেগাওয়াটে। চলতি গ্রীষ্ম মৌসুমে সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। এই বিপুল চাহিদার বিপরীতে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় কর্তৃপক্ষকে বর্তমানে লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের নীতি-নির্ধারকদের মতে, ক্রমবর্ধমান এই চাহিদা মেটাতে জ্বালানি আমদানির প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), হেভি ফুয়েল অয়েল (এইচএফও) এবং কয়লা আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে যাতে উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন রাখা সম্ভব হয়। বিদ্যুৎ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দাবি, রাজধানী ঢাকাকে লোডশেডিংয়ের আওতামুক্ত রাখতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তবে নতুন এই ১ হাজার ৯৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হলে কেবল রাজধানী নয়, বরং সারা দেশের লোডশেডিং পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রীষ্মকালীন ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা পূর্ণ ব্যবহার এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। আদানির দ্বিতীয় ইউনিট এবং কয়লাভিত্তিক বড় প্রকল্পগুলো থেকে বিদ্যুৎ আসা শুরু হলে বর্তমান সংকট অনেকটাই কেটে যাবে। তবে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈচিত্র্যকরণের ওপর আরও গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে নতুন এই বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো পূর্ণ মাত্রায় সক্রিয় হলে শিল্প উৎপাদন ও গৃহস্থালি পর্যায়ে ভোগান্তি কমে আসবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।