নিজস্ব প্রতিবেদক
দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক কর্মবাজার এবং প্রযুক্তিনির্ভর ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে রেখে দেশের সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) ও অন্যান্য সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের সংস্কার আনতে যাচ্ছে সরকার। প্রচলিত মুখস্থনির্ভর সিলেবাসের পরিবর্তে প্রার্থীদের প্রকৃত মেধা ও যোগ্যতা যাচাইয়ে স্কিল-বেজড বা দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রবর্তনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী এ তথ্য জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে রাজবাড়ী-২ আসনের সরকারি দলের সংসদ সদস্য মো. হারুন-অর-রশীদের টেবিলে উত্থাপিত একটি লিখিত প্রশ্নের জবাবে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী সরকারের এই পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, আধুনিক প্রশাসন গড়তে এবং যুগের চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় গুণগত পরিবর্তন আনা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। বর্তমান বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো গতানুগতিক মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে এনে প্রার্থীদের বাস্তবমুখী দক্ষতা ও বিশ্লেষণ ক্ষমতার মূল্যায়ন করা।
দীর্ঘকাল ধরে দেশের চাকরিপ্রার্থী ও শিক্ষাবিদদের তরফ থেকে বিসিএস পরীক্ষার সিলেবাস নিয়ে সমালোচনা ছিল যে, এটি অতিরিক্ত মাত্রায় তথ্য মুখস্থ করার ওপর নির্ভরশীল। এই প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী সংসদে জানান, দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর লক্ষ্য অর্জনে পিএসসি ইতিমধ্যে বিসিএস পরীক্ষার সিলেবাস সংস্কারের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটি বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশের সিভিল সার্ভিস বা সমমানের সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার সিলেবাস ও পদ্ধতি নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সিলেবাসে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও আধুনিক বিষয়াবলির সংযোজন করার কাজ এগিয়ে চলছে। এর ফলে আগামী দিনে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীদের কেবল তথ্য মনে রাখার ক্ষমতার বদলে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ, সমস্যা সমাধান এবং প্রায়োগিক জ্ঞানের ওপর বেশি জোর দেওয়া হবে।
শুধু লিখিত পরীক্ষাতেই নয়, চূড়ান্ত নিয়োগের ক্ষেত্রে মৌখিক পরীক্ষা বা ভাইভাতেও আসছে কাঠামোগত পরিবর্তন। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রার্থীদের সার্বিক যোগ্যতা নিরূপণে কমিশন শিগগিরই ‘কম্পিটেন্সি-বেজড ইন্টারভিউ’ বা যোগ্যতাভিত্তিক সাক্ষাৎকার (সিবিআই) পদ্ধতি চালু করতে যাচ্ছে। এই আধুনিক পদ্ধতির মাধ্যমে একজন প্রার্থীর ‘নলেজ, স্কিলস অ্যান্ড অ্যাটিটিউড’ (কেএসএ) অর্থাৎ জ্ঞান, দক্ষতা এবং দৃষ্টিভঙ্গি বা মনোভাবের গভীর মূল্যায়ন করা হবে। একজন সিভিল সার্ভেন্ট হিসেবে প্রার্থীর মানসিক পরিপক্বতা, নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
সরকারি কর্ম কমিশনের নিয়োগ প্রক্রিয়ার অন্যতম বড় একটি সমালোচনা ছিল এর দীর্ঘসূত্রতা। একটি বিসিএস পরীক্ষা শুরু থেকে শেষ করে চূড়ান্ত নিয়োগ দিতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যাওয়ার নজির রয়েছে। এই দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে আনতে সরকারের অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন আব্দুল বারী। তিনি জানান, চাকরিপ্রার্থীদের জীবনের মূল্যবান সময় যেন নষ্ট না হয়, সে জন্য এক বছরের মধ্যে একটি বিসিএসের সম্পূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে এবং এটি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
এই এক বছর মেয়াদি পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়নের উদাহরণ হিসেবে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ৫০তম বিসিএসের কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, ৫০তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সময়ই প্রথমবারের মতো প্রিলিমিনারি, লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার সুনির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশ করা হয়েছিল। পিএসসি সেই পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় ইতিমধ্যে ৫০তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়েছে এবং পূর্বঘোষিত রুটিন অনুযায়ী বর্তমানে লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের সিভিল সার্ভিসে একটি বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। মুখস্থনির্ভর পড়াশোনার বদলে শিক্ষার্থীরা সৃজনশীল ও বাস্তবমুখী জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী হবেন। একই সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা দূর হলে চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে হতাশা কমবে এবং তারা দ্রুত কর্মজীবনে প্রবেশ করে রাষ্ট্রীয় সেবায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন। প্রযুক্তিনির্ভর ও আধুনিক প্রশাসন যন্ত্র গড়ে তুলতে এমন যুগোপযোগী পদক্ষেপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।