জাতীয় ডেস্ক
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সেবা কোনো দয়া বা অনুকম্পা নয়, বরং তা সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকার বলে পুনর্ব্যক্ত করেছে সরকার। সাধারণ নাগরিকদের মতোই প্রতিটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সমান সুযোগ ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুপুরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত ‘প্রতিবন্ধী অধিকার ও সেবা সুরক্ষাবিষয়ক আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় ও বাস্তবায়ন কমিটি’র সভায় সরকারের এই নীতিগত অবস্থানের কথা জানানো হয়। সভায় প্রধান আলোচক হিসেবে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। এতে বিশেষ বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন পুতুল।
সভায় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত জানান, প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় মানসম্মত চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা পৌঁছে দিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে দেশের ২২টি জেলার ২২টি উপজেলায় ‘শিশু স্বর্গ’ শীর্ষক পাইলট প্রকল্প চালু করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের আওতায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেই প্রতিবন্ধী শিশু ও ব্যক্তিদের জন্য সার্বিক চিকিৎসাসেবা প্রদান নিশ্চিত করা হবে। প্রান্তিক পর্যায়ের পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় রাজধানী ঢাকার কড়াইল বস্তিতে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও ধারাবাহিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে।
যাতায়াত ও গণপরিবহনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন, সরকারের সমন্বিত উদ্যোগের ফলে ইতিমধ্যে বাস্তবমুখী অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের যেকোনো শ্রেণি এবং আধুনিক মেট্রোরেলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ভাড়ায় ২৫ শতাংশ ছাড় কার্যকর করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের নবনির্মিত সকল রেল ও বাস স্টেশনে প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো নিশ্চিত করার সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শুধুমাত্র যাতায়াতের র্যাম্প নির্মাণেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে না; বরং টিকিট সংগ্রহ, প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ, যানবাহনে আরোহণ এবং ব্যবহারোপযোগী শৌচাগার নিশ্চিত করাসহ পুরো ভ্রমণ প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ নির্বিঘ্ন ও এক্সেসিবল করার কাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে।
মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থায় প্রতিবন্ধী শিশুদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার বিষয়ে সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়। ড. মুহিত জানান, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামো ও পাঠদান কার্যক্রম আরও সুসংগঠিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে সাধারণ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোকে প্রতিবন্ধীবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার কাজ চলছে, যাতে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কিংবা হুইলচেয়ার ব্যবহারের কারণে কোনো শিশুই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে ঝরে না পড়ে। এর অংশ হিসেবে জাতীয় পাঠ্যক্রমে প্রয়োজনীয় সংস্কার, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য ব্রেইল পদ্ধতি এবং বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধীদের জন্য সাইন ল্যাঙ্গুয়েজের সর্বজনীন ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো কাজ করছে।
সভায় সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন পুতুল বলেন, শুধুমাত্র ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়নই যথেষ্ট নয়, বর্তমান ডিজিটাল যুগে সরকারি-বেসরকারি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও তথ্যপ্রযুক্তিতেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমান প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। প্রতিটি প্রতিবন্ধী মানুষের অন্তর্নিহিত সুপ্ত মেধা ও উৎপাদনশীল দক্ষতাকে জাতীয় উন্নয়নে সম্পৃক্ত করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়াই সরকারের মূল লক্ষ্য। তিনি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার যথাযথ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও দায়বদ্ধতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।