কূটনৈতিক প্রতিবেদক
পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস, ভৌগোলিক সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সম্মানজনক কূটনৈতিক আমন্ত্রণের ভিত্তিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার এ বিষয়ে কোনো তাড়াহুড়ো না করার নীতি বজায় রেখেছে।
রাজধানীর মিন্টু রোডের সরকারি বাসভবনে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা সরকারের সামগ্রিক পররাষ্ট্রনীতির অগ্রগতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কৌশলগত ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আগে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের সফর নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরগুলো অনুমাননির্ভর। তবে দুই দেশের ঐকমত্যের ভিত্তিতে উপযুক্ত কূটনৈতিক পরিবেশ তৈরি হলে আসন্ন সম্মেলনে অংশগ্রহণ নিয়ে ঢাকা ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করবে।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়ন ও শীর্ষ পর্যায়ের সফরের বিষয়টি ভারতের বর্তমান নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ওপর অনেকাংশেই নির্ভর করছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বাস্তবতাকে অনুধাবন করে জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত সরকারের সঙ্গে ভারত কী ধরনের সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করতে চায়, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
প্রতিবেশী দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বিনষ্টের তৎপরতা প্রসঙ্গে তিনি গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, দেশের আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সেখানে রাজনৈতিক বা প্রচারমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ প্রদান কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও আন্তর্জাতিক নিয়মের পরিপন্থী। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে এ বিষয়ে নয়াদিল্লির কাছে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং সার্বভৌম স্বার্থ রক্ষায় কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকবে।
বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির জানান, বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে ভারসাম্য বজায় রেখে এগিয়ে যাচ্ছে ঢাকা। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সমন্বয়ে গঠিত সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বা প্রতিরক্ষা রূপরেখায় যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করে বাংলাদেশ ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। খুব শিগগিরই প্রধানমন্ত্রীর সৌদি আরব সফর চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের সাথে বাণিজ্য ও জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারের প্রক্রিয়া চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, সয়াবিন আমদানি ও বোয়িং বিমান ক্রয়ের বিষয়ে আলোচনার পাশাপাশি ইইউ’র সাথে অংশীদারিত্ব চুক্তি নিয়ে অগ্রগতি হয়েছে। অন্যদিকে, চীনের সাথে ‘টু প্লাস টু’ মেকানিজম এবং কম্প্রিহেন্সিভ পার্টনারশিপের আওতায় সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের সাফল্যের চিত্র তুলে ধরে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের প্রেসিডেন্সি নির্বাচনে বাংলাদেশের বিজয়ে বৈশ্বিক আস্থা প্রতিফলিত হয়েছে। এই আন্তর্জাতিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে মিয়ানমার ও সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের ওপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনের উদ্যোগ জোরদার করা হবে। পাশাপাশি আফ্রিকার উদীয়মান বাজারে কন্ট্রাক্ট ফার্মিং ও বাংলাদেশি পণ্যের রফতানি বাড়াতে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সফরের প্রস্তুতি চলছে। এছাড়া শীর্ষ পর্যায়ের ইতিবাচক আলোচনার মাধ্যমে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের জটিলতা কাটিয়ে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া দ্রুত পুনরায় চালুর বিষয়েও অগ্রগতি হয়েছে।